বিশ্বকাপে এবার ছোট দলগুলোর গোলরক্ষকেরা যেমন অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, তেমনি বিশ্বের নামকরা গোলরক্ষকদের একের পর এক ভুল নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, এটি কি শুধুই ফর্মের সমস্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে বিশ্বকাপের নতুন অফিসিয়াল বল ‘ত্রিওনদা’র প্রভাব? সাবেক কয়েকজন তারকা গোলরক্ষকও সেই প্রশ্ন তুলেছেন।
এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষেও কোনো গোল হজম করেননি। অন্যদিকে কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলয় রম এক ম্যাচেই ১৫টি সেভ করে নজর কাড়েন। ইরানের আলীরেজা বেইরানভান্দও দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বেলজিয়ামের আক্রমণ সামলেছেন। ছোট দলগুলোর এসব গোলরক্ষক নিজেদের অসাধারণ নৈপুণ্যে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করছেন।
অন্যদিকে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের হয়ে নিয়মিত খেলা পরিচিত গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্স ঠিক উল্টো চিত্র তুলে ধরেছে। ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড, সেনেগালের এদুয়ার্দো মেন্দি, বেলজিয়ামের থিবো কর্তোয়া কিংবা জার্মানির মানুয়েল নয়্যারের মতো অভিজ্ঞ তারকারাও একাধিক ম্যাচে অস্বাভাবিক ভুল করেছেন। ফলে তাদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠছে ফুটবল অঙ্গনে।
অনেকে অবশ্য এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বয়স, ক্লান্তি কিংবা ফর্মহীনতার কথাই বলছেন। তবে আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় উঠে এসেছে। সেটি হলো এবারের বিশ্বকাপে ব্যবহৃত নতুন অফিসিয়াল বল ‘ত্রিওনদা’। নতুন প্রযুক্তির এই বল গোলরক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে কি না, তা নিয়েই এখন চলছে বিতর্ক।
প্রতি বিশ্বকাপের মতো এবারও অফিসিয়াল ম্যাচ বল তৈরি করেছে জার্মান ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। ফিফার সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে তৈরি করা ‘ত্রিওনদা’ বলে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। এতে থাকা বিশেষ সেন্সর বলের প্রতিটি স্পর্শ রেকর্ড করতে পারে, যা অফসাইড কিংবা হ্যান্ডবলের মতো সিদ্ধান্ত নিতে রেফারিদের সহায়তা করছে।
এই প্রযুক্তির কারণেই সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব সূক্ষ্ম অফসাইডও ধরা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে সামান্য হ্যান্ডবলের ঘটনাও শনাক্ত করা যাচ্ছে। তবে প্রযুক্তিগত সুবিধার পাশাপাশি বলটির উড়ন্ত গতি ও আচরণ গোলরক্ষকদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে কি না, সেটিই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট এবং ডেনমার্কের কিংবদন্তি গোলরক্ষক ক্যাসপার স্মাইকেল। স্মাইকেলের দাবি, নতুন বলটি প্রচলিত বলের তুলনায় ভিন্ন আচরণ করে। বিশেষ করে বাতাসে বলের গতি ও ঘূর্ণন গোলরক্ষকদের হিসাবকে কঠিন করে তুলছে।
স্মাইকেল জানান, ‘ত্রিওনদা’ বলটি মাত্র চারটি প্যানেল দিয়ে তৈরি এবং এতে কোনো সেলাই নেই। সম্পূর্ণভাবে একসঙ্গে জোড়া লাগানো এই বল ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়ায় আগের বলগুলোর মতো আচরণ করে না। তার মতে, বাতাসে বলের ঘূর্ণন ও ভেসে থাকার ধরন বদলে যাওয়ায় গোলরক্ষকদের শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার ভাষায়, মাত্র এক সেকেন্ডের সামান্য পরিবর্তনও একজন গোলরক্ষকের জন্য বিশাল পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। বলের গতিপথ শেষ মুহূর্তে সামান্য বদলে গেলে সেটি ঠেকানোর সুযোগ অনেক সময় আর থাকে না। ফলে সহজ মনে হওয়া শটও গোল হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বকাপের বিভিন্ন ম্যাচেও এমন দৃশ্য একাধিকবার দেখা গেছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জর্ডান পিকফোর্ড, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লুকা জিদান কিংবা ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের শট ঠেকাতে গিয়ে এদুয়ার্দো মেন্দির মতো গোলরক্ষকেরাও শেষ মুহূর্তে বলের গতিপথ সামলাতে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে হাতে লাগার পরও বল জালে ঢুকে গেছে।
পরিসংখ্যানও কিছুটা সেই আলোচনাকে উসকে দিচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব শেষ পর্যন্ত ডি-বক্সের বাইরে থেকে মোট ২৮টি গোল হয়েছে। এক বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে সর্বোচ্চ ৩০ গোলের রেকর্ড রয়েছে ১৯৯৪ সালের আসরে, যেটিও হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে এবার সেই রেকর্ডও হুমকির মুখে।
এছাড়া এবার গোলরক্ষকের ভুল কিংবা হাতে স্পর্শ লেগে গোল হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে ১২ বার। এমন সংখ্যা অতীতের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় অনেক বেশি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও এর পুরো দায় বলের ওপর চাপাতে রাজি নন অনেক বিশেষজ্ঞ।
ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্টও নিজের পডকাস্টে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, এবারের বিশ্বকাপে এমন অনেক শট দেখা যাচ্ছে, যেগুলো গোলরক্ষকের হাতে লাগছে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। আগে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যেত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে বলই একমাত্র কারণ কি না, সেটি নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। আধুনিক প্রযুক্তির বল, পরিবর্তিত খেলার গতি, শক্তিশালী শট এবং মানসিক চাপ—সবকিছু মিলিয়েই গোলরক্ষকদের কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর এই বিতর্ক নিয়ে আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ সামনে আসবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

























