বুলিমিয়া নার্ভোসা একটি গুরুতর খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অল্প সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন, যা ‘বিঞ্জ ইটিং’ নামে পরিচিত। এরপর অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার কারণে তাদের মধ্যে তীব্র অপরাধবোধ, উদ্বেগ ও ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে।
এই মানসিক চাপ থেকেই শুরু হয় ক্ষতিপূরণমূলক আচরণ। অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করেন, অতিরিক্ত ব্যায়াম করেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন কিংবা জোলাপের অপব্যবহার করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব আচরণ সাময়িকভাবে মানসিক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বুলিমিয়া নার্ভোসার প্রধান লক্ষণ
বুলিমিয়া নার্ভোসায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে—
- ওজন বেড়ে যাওয়ার তীব্র ভয়
- বারবার অতিরিক্ত খাবার খাওয়া
- খাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি
- একা একা প্রচুর খাবার খাওয়া
- খাবার খাওয়ার পর অপরাধবোধে ভোগা
- ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা
- অতিরিক্ত ব্যায়াম করা
- দীর্ঘ সময় উপোস থাকা
- নিজের শরীর ও ওজন নিয়ে অতিরিক্ত অসন্তোষ
- মেজাজের দ্রুত পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তি তার সমস্যাটি পরিবার বা বন্ধুদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেন। ফলে রোগটি দীর্ঘ সময় শনাক্ত না-ও হতে পারে।
চিকিৎসা না হলে বুলিমিয়া নার্ভোসা শরীরে নানা জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বারবার বমি করার কারণে দাঁতের এনামেল ক্ষয়, মাড়ির রোগ, গলাব্যথা এবং খাদ্যনালির ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত জোলাপ ব্যবহারে শরীরে পানিশূন্যতা, পটাশিয়ামের ঘাটতি, দুর্বলতা ও কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, হৃদ্যন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি এবং শরীরের খনিজ ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো জটিল সমস্যাও দেখা দিতে পারে। মানসিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, বুলিমিয়া নার্ভোসার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে জিনগত প্রভাব, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধের অভাব, শৈশবের মানসিক আঘাত এবং ওজন ও সৌন্দর্য নিয়ে সামাজিক চাপ এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে ফ্যাশন ও মডেলিং জগতে রোগা থাকার চাপ এবং শরীর নিয়ে অতিরিক্ত মূল্যায়নের কারণে এই রোগ বেশি আলোচিত। তবে এটি কেবল মডেলদের রোগ নয়; যেকোনো বয়স, পেশা বা লিঙ্গের মানুষের মধ্যেই দেখা দিতে পারে।
সুসংবাদ হলো, বুলিমিয়া নার্ভোসা চিকিৎসাযোগ্য একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT), পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।


























