ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় পৃথক বজ্রাঘাতের ঘটনায় একই দিনে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এছাড়া আরও দুইজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোববার (২ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার ভোমরাদহ ইউনিয়নের কুশারীগাঁও গ্রামের একটি মুদি দোকানে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বসে কথা বলছিলেন। এ সময় হঠাৎ প্রবল বজ্রপাত হলে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
স্থানীয়রা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শান্তি রানী (মুদি দোকান মালিক মহেন রায়ের স্ত্রী) এবং সুয়ের রাম (মৃত বেয়ারু রামের ছেলে)-কে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় আহত টেপরা ও শাহলনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকরা তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
অন্যদিকে, একই দিন উপজেলার সেনুয়া ডাঙ্গীবস্তি এলাকায় বজ্রাঘাতে আহত হন রুনা নামে এক গৃহবধূ। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারও মৃত্যু হয়।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রামাণিক জানান, পৃথক বজ্রাঘাতের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বজ্রঝড়ের সময় মেঘের ভেতরে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। এই চার্জের পার্থক্য অত্যধিক বেড়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক স্রোত সৃষ্টি হয়, যা বজ্রপাত হিসেবে দেখা যায়। একটি বজ্রপাতের তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে—
- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন।
- প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে ঘন ঘন বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি।
- উঁচু গাছ বা খোলা মাঠে মানুষের অবস্থান।
- কৃষিকাজ ও মাছ ধরার সময় খোলা জায়গায় দীর্ঘক্ষণ অবস্থান।
- বনাঞ্চল ও বড় গাছ কমে যাওয়ার প্রভাব।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে Artificial Intelligence (AI) ব্যবহার করে বজ্রপাতের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করার চেষ্টা চলছে। AI স্যাটেলাইট ছবি, রাডার তথ্য, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুচাপ এবং মেঘের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করতে পারে।
AI-ভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে—
- বজ্রপাতের সম্ভাব্য সময় ও স্থান দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
- মোবাইলে আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব।
- কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সহায়তা করা যায়।
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
তবে AI পূর্বাভাস দিলেও এটি শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না। তাই সরকারি আবহাওয়া সতর্কবার্তাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে অনুসরণ করা উচিত।
বজ্রপাতের সময় যা করবেন:
- বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত পাকা ভবনের ভেতরে আশ্রয় নিন।
- খোলা মাঠ, নদী, বিল, হাওর বা জলাশয়ে অবস্থান করবেন না।
- বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা টাওয়ারের নিচে দাঁড়াবেন না।
- ধাতব বস্তু, ছাতা, মাছ ধরার ছিপ বা কৃষিযন্ত্র থেকে দূরে থাকুন।
- ঘরের ভেতরে থাকলে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখুন।
- মোবাইল ব্যবহার নিরাপদ হলেও চার্জে লাগানো অবস্থায় ব্যবহার না করাই ভালো।
- মোটরসাইকেল, সাইকেল বা নৌকায় থাকলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান।
বজ্রপাতে কেউ আহত হলে যা করবেন:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ; তার শরীরে কোনো বিদ্যুৎ থাকে না।
- দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করুন।
- শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদস্পন্দন বন্ধ থাকলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেউ CPR দিতে পারেন।
- অযথা পানি ঢালা বা কুসংস্কারে বিশ্বাস না করে দ্রুত হাসপাতালে নিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে সচেতনতা বৃদ্ধি, আগাম সতর্কবার্তা অনুসরণ এবং নিরাপত্তাবিধি মেনে চললে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।



























