চীনের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ ঘূর্ণিঝড় ‘বাভি’ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কতা জারি করেছে। ঝড়টি উপকূলে আঘাত হানার আগেই ঝেজিয়াং, ফুজিয়ান, সাংহাইসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। উপকূলীয় এলাকার সব মাছ ধরার নৌযানকে নিরাপদ বন্দরে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং বহু ফেরি সার্ভিস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। উপকূলসংলগ্ন পর্যটন কেন্দ্র, সমুদ্রসৈকত ও বিনোদন এলাকা জনসাধারণের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগে প্রবেশের পর বাতাসের গতি ধীরে ধীরে কমলেও এর সঙ্গে থাকা বিশাল বৃষ্টিবাহী মেঘ এখনো অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। ঝেজিয়াং, ফুজিয়ান, জিয়াংসু, আনহুই এবং সাংহাইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে, আর কিছু অঞ্চলে এই পরিমাণ ৪০০ মিলিমিটারেরও বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। ফলে আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং শহরাঞ্চলে ব্যাপক জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে স্থানীয় প্রশাসন বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিযোগাযোগ সেবা সচল রাখতে বিশেষ জরুরি প্রকৌশল দল মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী, দমকল বাহিনী, পুলিশ, সেনাসদস্য এবং চিকিৎসা দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুত করা হয়েছে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত সহায়তা পান।
ঝড়ের প্রভাবে চীনের পূর্বাঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাংহাই, ঝেজিয়াং ও ফুজিয়ানের বিভিন্ন শহরে শত শত ট্রেন ও দূরপাল্লার বাস সার্ভিস বাতিল অথবা সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোতে শত শত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ায় হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এছাড়া বেশ কয়েকটি সমুদ্রবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় পণ্য পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটেছে। শিল্পকারখানা, নির্মাণ প্রকল্প এবং উপকূলীয় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়টির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু প্রবল বাতাস নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অতিবৃষ্টি। ঝড়টি দুর্বল হয়ে গেলেও এর বৃষ্টিবাহী মেঘ কয়েক দিন সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়া, নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে, সেখানে নতুন করে আরও বৃষ্টি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ধান, ভুট্টা, সবজি ও ফলের বাগান প্রবল বাতাস ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলের মাছের ঘের, চিংড়ি চাষ এবং অন্যান্য জলজ সম্পদও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক কৃষক আগাম ফসল সংগ্রহ এবং কৃষিজমি রক্ষায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় জনগণকে অপ্রয়োজনীয় বাইরে বের না হওয়া, নদী, খাল, পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি হটলাইন ও উদ্ধারকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন শহরে ২৪ ঘণ্টার জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।
এদিকে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি দায়ী। উষ্ণ সমুদ্র থেকে ঘূর্ণিঝড় অতিরিক্ত শক্তি সংগ্রহ করতে পারায় এখন ঝড়গুলো আরও বেশি বৃষ্টি এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করছে। তাই ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।



























