রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ২০২৬ বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামছে। অপ্টা সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত কঠিন এক পথ পাড়ি দিতে হতে পারে সেলেসাওদের। তবে সেই পথ অতিক্রম করতে পারলে ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ওঠার সুযোগ থাকবে তাদের সামনে।
২০০২ সালে জাপানের ইয়োকোহামায় জার্মানিকে হারিয়ে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। মাঝের সময়ে প্রতিবারই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি।
বিশেষ করে গত পাঁচটি বিশ্বকাপের চারটিতে কোয়ার্টার ফাইনালেই থেমে যেতে হয়েছে তাদের। ২০১৪ সালে নিজ দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের অবিশ্বাস্য পরাজয় এখনো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
এবার ব্রাজিলের দায়িত্বে আছেন অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য অর্জনের পর তিনি জাতীয় দলের ডাগআউটে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। তার লক্ষ্য ব্রাজিলিয়ান সৃজনশীলতা ও ইতালিয়ান শৃঙ্খলার সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তোলা।
নিউ জার্সিতে দলের প্রস্তুতি ক্যাম্পে আনচেলত্তি জানিয়েছেন, ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলোয়াড়দের রক্তে মিশে আছে। তবে সেই সঙ্গে তিনি কঠোর পরিশ্রম, রক্ষণভাগের সংগঠন এবং কৌশলগত শৃঙ্খলাও যোগ করতে চান।
অপ্টা সুপারকম্পিউটারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ব্রাজিল রয়েছে গ্রুপ ‘সি’-তে। তাদের সঙ্গে একই গ্রুপে আছে মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড। কাগজে-কলমে ব্রাজিলই এই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল।
পরিসংখ্যান বলছে, গ্রুপ পর্ব থেকে ব্রাজিলের পরের রাউন্ডে ওঠার সম্ভাবনা ৯৬.৯ শতাংশ। পুরো টুর্নামেন্টে কেবল স্পেনের সম্ভাবনা তাদের চেয়ে বেশি। ফলে গ্রুপ পর্বে কোনো বড় ধরনের অঘটন না ঘটলে সেলেসাওদের পরের ধাপে যাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত ধরা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের রেকর্ডও অসাধারণ। ১৯৮২ সালের পর প্রতিটি বিশ্বকাপেই তারা নিজেদের গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবে নকআউট পর্বে উঠেছে। এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
মরক্কোকে অবশ্য হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল তারা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের পারফরম্যান্সও বেশ ধারাবাহিক।
অন্যদিকে স্কটল্যান্ডও ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় নিয়মিত উন্নতি করছে। তবে ব্রাজিলের তারকাবহুল স্কোয়াড এবং বিশ্বমঞ্চে অভিজ্ঞতা তাদের বড় সুবিধা দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হাইতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষ হলেও বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে কোনো দলকেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। ব্রাজিলের লক্ষ্য থাকবে গ্রুপ পর্ব থেকেই নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে উঠতে পারলে ব্রাজিলের সামনে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে আসতে পারে জাপান। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে জাপান গত এক দশকে ধারাবাহিক উন্নতি করেছে।
সম্প্রতি ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল জাপান। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল।
তবে সামগ্রিক পরিসংখ্যান ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলে। দুই দলের ১৪টি ম্যাচের মধ্যে ১১টিতে জয় পেয়েছে সেলেসাওরা। সেই কারণে অপ্টা এই ধাপ অতিক্রম করার সম্ভাবনা ৬২.১ শতাংশ দেখাচ্ছে।
জাপানকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে গেলে ব্রাজিলের সামনে আসতে পারে নরওয়ে। দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে ফেরা ইউরোপীয় দলটি আর্লিং হালান্ডকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে।
বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হালান্ডের উপস্থিতি নরওয়েকে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষে পরিণত করেছে। তবে বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা তাদের বড় শক্তি।
বিশ্বকাপের শেষ ষোল বা সমমানের নকআউট পর্বে ব্রাজিলের রেকর্ড অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১০ ম্যাচের মধ্যে ৯টিতে জয় পেয়েছে তারা এবং সর্বশেষ আটটি ম্যাচ টানা জিতেছে।
অপ্টার হিসাবে নরওয়ের বাধা পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা ৩৮ শতাংশ। যদিও এই পর্যায় থেকেই প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইংল্যান্ডকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বড় টুর্নামেন্টের শেষ দিকে পৌঁছানো দলগুলোর মধ্যে অন্যতম ইংল্যান্ড।
অপ্টার বিশ্লেষণে ইংল্যান্ড শিরোপার অন্যতম দাবিদার। শক্তিশালী স্কোয়াড, তরুণ প্রতিভা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তাদের অন্যতম বড় সম্পদ।
তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে ব্রাজিল কিছুটা এগিয়ে। দুই দলের শেষ ১২ দেখায় মাত্র একবার হেরেছে সেলেসাওরা। পাঁচটি জয়ের পাশাপাশি ছয়টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের স্মরণীয় সাফল্য রয়েছে। ২০০২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে রোনালদিনহোর অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিক গোল এখনো ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অপ্টা ২২ শতাংশ হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ এই ধাপটি হতে পারে ব্রাজিলের জন্য অন্যতম বড় পরীক্ষা।
সেমিফাইনালে অপেক্ষা করতে পারে ফ্রান্স। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি হলো ফরাসিরা। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২২ সালে ফাইনাল খেলা তাদের শক্তির প্রমাণ।
ব্রাজিল ও ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ইতিহাস নাটকীয় ঘটনায় ভরপুর। ১৯৫৮ সালের সেমিফাইনালে ব্রাজিল জিতলেও পরবর্তী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আধিপত্য ছিল ফরাসিদের।
১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ১৯৯৮ সালের ফাইনালে জিনেদিন জিদানের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ৩-০ গোলে জয় পায় ফ্রান্স।
২০০৬ বিশ্বকাপেও কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে দেয় ফরাসিরা। ফলে এই ম্যাচটি হলে সেটি হবে ইতিহাসের আরেকটি বড় অধ্যায়।
অপ্টার হিসাব অনুযায়ী সেমিফাইনাল পেরিয়ে ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা ব্রাজিলের ১২.৫ শতাংশ। যদিও নকআউট পর্বে একটি ভালো ম্যাচ পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
ফাইনালে উঠতে পারলে ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ স্পেন। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে স্প্যানিশরা।
অপ্টা সুপারকম্পিউটার স্পেনকে পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় শিরোপা দাবিদার হিসেবে দেখছে। তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গড়া দলটি ইতোমধ্যে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।
তবে স্পেনের বিপক্ষেও ব্রাজিলের পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক। দুই দলের ১০ ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে ব্রাজিল, হেরেছে মাত্র দুটি ম্যাচে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিল-স্পেন লড়াই হলে সেটি নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি হবে। দুই ফুটবল সংস্কৃতির লড়াই বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শকের নজর কাড়বে।
সব হিসাব-নিকাশ শেষে অপ্টা ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ৬.৭ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এই তালিকায় তাদের ওপরে রয়েছে আরও কয়েকটি শক্তিশালী দল।
তবে ফুটবল কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়। ইতিহাস বলছে, বড় মঞ্চে ব্রাজিল বহুবার নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে এবং কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
কার্লো আনচেলত্তিও আত্মবিশ্বাসী। তার বিশ্বাস, বর্তমান স্কোয়াডে এমন অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে যারা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম।
এখন প্রশ্ন একটাই—২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে কি সত্যিই ‘হেক্সা’ পূরণ করতে পারবে ব্রাজিল? সেই উত্তর মিলবে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ফাইনালে, অথবা তারও আগে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর নকআউট যাত্রায়।
























