দেশে সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এর প্রভাবে দিন দিন বাড়ছে হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ, ধর্ষণ ও নৃশংস অপরাধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয় এখন শুধু ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়া, পরকীয়া, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া একাধিক নৃশংস ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা ও মানবিকতা কমে যাচ্ছে। ফলে সামান্য বিরোধ থেকেও ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে মাদক। মাদকসেবীরা নেশার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে ছিনতাই, অপহরণ, খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে মাদকের কারণে পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে এবং সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস হচ্ছে।
এছাড়া পরকীয়া ও পারিবারিক কলহও নৃশংস অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পরিবারে অশান্তি, সন্দেহ এবং সম্পর্কের অবনতি থেকে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোবাইল ফোনে অশ্লীল ভিডিও ও অনৈতিক কনটেন্টের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এতে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে নৈতিকতার অবক্ষয় বাড়ছে। তারা সহিংসতা ও বিকৃত মানসিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে বিদেশি ধারাবাহিক নাটক ও বিনোদনমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবও দায়ী বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অবৈধ সম্পর্ক ও অশ্লীলতাকেন্দ্রিক গল্প তরুণদের মনোজগতে প্রভাব ফেলছে। এদিকে অনলাইন জুয়ার বিস্তার সমাজে নতুন ধরনের সংকট তৈরি করেছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখন অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি অপরাধও বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জুয়ার টাকা জোগাড় করতে অনেকেই অপরাধের পথ বেছে নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনাও বেড়েছে। ফেক পরিচয় তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল, অর্থ আদায় এবং মানসিক হয়রানির মতো অপরাধ বাড়ছে। সাইবার অপরাধ এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গত মার্চ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু রাজধানীতেই ওই মাসে ২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৬টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি এবং অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ২০টি। বিভিন্ন অপরাধে এক হাজার ৩০৫টি মামলা হয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার নামে এক গার্মেন্টকর্মীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে পারিবারিক কলহের জেরে মাহিনুর আক্তার নামে এক গৃহবধূকে কোদাল দিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতা এখন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১১ বছর বয়সী শিশু রেশমি। বর্তমানে সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় অনলাইন জুয়ার টাকার বিরোধকে কেন্দ্র করে অপহরণের পর হত্যা করা হয় শিশু আন্দালিব সাদমান রাফিকে। পরে অভিযুক্তের বাড়ির স্যানিটারি ল্যাট্রিন থেকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনাও দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক লেনদেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও পরকীয়ার জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সহিংসতা ও পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে প্রায় ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতিও অপরাধ বাড়ার বড় কারণ। অপরাধীরা যখন দেখে যে অপরাধ করেও অনেক ক্ষেত্রে পার পাওয়া যায়, তখন তাদের মধ্যে ভয় কমে যায়। ফলে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, দেশে সামাজিক মূল্যবোধের বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন কর্মহীনতা, মাদকাসক্তি, অবৈধ সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কিছু মানুষ পরিবারকে বোঝা মনে করছে। স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে নতুন জীবন শুরু করার মতো ভয়ংকর মানসিকতা সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রশিদুল হক বলেন, বর্তমান প্রজন্ম নেতিবাচক পরিবেশে বড় হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, কুৎসা ও ভয় ছড়ানো মানুষের মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে তরুণদের মধ্যে হতাশা ও সহিংস মনোভাব বাড়ছে।তিনি আরও বলেন, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে মোবাইল গেম আসক্তি ভয়াবহভাবে বাড়ছে। রাত জেগে গেম খেলার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং আচরণে আগ্রাসী মনোভাব দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয় রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মাদক, অনলাইন জুয়া ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তারা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, সমাজে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে।




























