লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে ইতিহাস গড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে নিজেদের সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে স্বাগতিকরা। কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর অধীনে এটি ছিল দলটির অন্যতম স্মরণীয় জয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কোনো ম্যাচে চার গোল করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে তারা। আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং কার্যকর ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য দেখিয়েছে স্বাগতিক দল।
সোফি স্টেডিয়ামে ম্যাচটি ঘিরে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন ফিফা সভাপতি Gianni Infantino, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio, বাস্কেটবল কিংবদন্তি Kareem Abdul-Jabbar এবং ফুটবল তারকা David Beckham।
শুধু ক্রীড়াজগতের তারকারাই নন, হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা Leonardo DiCaprio এবং Tom Cruise-কেও দেখা গেছে গ্যালারিতে। ফলে ম্যাচটি যেন ফুটবল এবং বিনোদন জগতের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল।
খেলা শুরুর পর থেকেই প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র সপ্তম মিনিটেই সেই চাপের ফল পেয়ে যায় তারা। মিডফিল্ডার ওয়েস্টন ম্যাককেনির তৈরি আক্রমণ থেকে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা।
ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ম্যাককেনির উদ্দেশে পাস বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে সেই বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিজেদের জালেই বল পাঠিয়ে দেন প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডার বোবাদিয়া। আত্মঘাতী গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।
প্রথম গোলের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে পচেত্তিনোর শিষ্যরা। ধারাবাহিক আক্রমণে প্যারাগুয়ের ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখে তারা। এক পর্যায়ে ফ্লোরিয়ান বালোগান বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল করা হয়।
তবে গোলের জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি বালোগানকে। ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে পুলিসিকের নিখুঁত পাস থেকে ডিফেন্স লাইনের পেছনে জায়গা তৈরি করে প্রথম ছোঁয়াতেই বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। এতে ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবারও জ্বলে ওঠেন বালোগান। বক্সের মধ্যে দুই ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে ঠান্ডা মাথায় দুর্দান্ত ফিনিশ করেন তিনি। তার দ্বিতীয় গোল এবং দলের তৃতীয় গোলের মাধ্যমে প্রথমার্ধ শেষ হয় ৩-০ ব্যবধানে।
দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে প্যারাগুয়ে। পাশাপাশি ম্যাচে দেখা দেয় বিতর্কও। এক পর্যায়ে মিগুয়েল আলমিরনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্ডার টিম রিমকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি।
তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির সাহায্যে ঘটনাটি পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা হয়। এরপর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রিমের কার্ড বাতিল করা হয়। বরং অভিনয়ের দায়ে হলুদ কার্ড দেখতে হয় আলমিরনকেই।
ম্যাচের শেষভাগে বদলি খেলোয়াড় মাউরিসিও প্যারাগুয়েকে কিছুটা আশা ফিরিয়ে দেন। আলমিরনের পাস থেকে দুর্দান্ত এক ফিনিশে গোল করে ব্যবধান কমান তিনি। এতে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-১।
গোল হজম করার পরও আক্রমণ থামায়নি যুক্তরাষ্ট্র। বরং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আরও একটি গোলের খোঁজে ছিল তারা। প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ তখনও স্বাগতিকদের গতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল।
যোগ করা সময়ের একেবারে শেষ আক্রমণে আসে ম্যাচের শেষ গোলটি। দ্রুতগতির আক্রমণ থেকে বল পেয়ে জিও রেইনা নিখুঁত শটে জাল খুঁজে নেন। তার গোলেই স্কোরলাইন হয় ৪-১।
এই গোলের মাধ্যমেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়ে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে টুর্নামেন্টে শক্তিশালী বার্তাও দিয়ে রাখে পচেত্তিনোর দল। স্বাগতিকদের এই দাপুটে পারফরম্যান্স এখন অন্য দলগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বকাপের শুরুতেই এমন বড় জয় যুক্তরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেবে। পুলিসিক, বালোগান, ম্যাককেনি এবং রেইনার মতো তারকারা যে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন, তা এই ম্যাচেই স্পষ্ট হয়েছে। সামনে আরও কঠিন পরীক্ষার অপেক্ষা থাকলেও প্রথম ম্যাচে ইতিহাস গড়ে দারুণ সূচনা করেছে স্বাগতিকরা।
























