শাহবাগ থানায় সাংবাদিকরা হামলার ঘটনায় মামলা করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই থানায় মামলা দায়ের করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো অগ্রগতি পাননি তারা। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় ছয় ঘণ্টা থানায় অবস্থান করেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দেখা মেলেনি। এতে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার রাত আটটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অন্তত দশজন সদস্য শাহবাগ থানায় যান। আগের রাতে থানার ভেতরে সংঘটিত হামলার ঘটনায় তারা মামলা দায়েরের উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হন। হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের ১২ জন চিহ্নিত নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু থানায় গিয়ে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, থানায় উপস্থিত হওয়ার পর তারা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসির দেখা পাননি। শুধু তাই নয়, থানার অন্য কর্মকর্তারাও ওসির অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
শাহবাগ থানায় সাংবাদিকরা জানান, হামলার মতো গুরুতর ঘটনায় মামলা গ্রহণে এমন ধীরগতি অস্বাভাবিক। একটি থানার অভ্যন্তরে সংঘটিত ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল বলে তারা মনে করেন। অথচ বাস্তবে অভিযোগপত্র জমা দিয়েও তারা অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ওসি উপস্থিত হলে মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। কিন্তু রাত গভীর হলেও ওসির উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে থানায় অবস্থান করেও মামলা গ্রহণের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, কোনো উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার অপেক্ষা করা হচ্ছে। হামলার শিকার হয়েও বিচার চাইতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর পরও মামলা নিতে দেরি করা স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি অবজ্ঞার শামিল। একই সঙ্গে এটি দেশের প্রচলিত আইনের প্রতিও অসম্মান বলে মনে করেন তিনি। এমন আচরণ হামলাকারীদের উৎসাহিত করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
শাহবাগ থানায় সাংবাদিকরা আরও অভিযোগ করেন, পুলিশের এমন আচরণ শুধু একটি মামলার বিলম্ব নয়। এটি সামগ্রিকভাবে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাংবাদিকরা যদি থানার ভেতরেও নিরাপদ না হন, তবে সাধারণ পরিবেশে নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত—সেই প্রশ্নও উঠছে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধভাবে তাদের ওপর চড়াও হয় একদল ব্যক্তি। এ ঘটনায় অন্তত দশজন সাংবাদিক আহত হন বলে জানা গেছে। কয়েকজনকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসাও নিতে হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় থানার ভেতরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকলেও হঠাৎ তাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়। এতে ক্যামেরা, মোবাইল ফোনসহ কিছু সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর থেকেই দোষীদের বিচারের দাবি জানানো হচ্ছে।
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময় সংবাদ সংগ্রহে বাধা, ভয়ভীতি এবং শারীরিক হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় দ্রুত বিচার না হওয়ায় দায়ীদের মধ্যে ভয় কাজ করে না। ফলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার ঝুঁকি বাড়ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, থানার ভেতরে সংঘটিত হামলার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কারণ একটি থানা নাগরিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে যদি ভুক্তভোগীরা সুরক্ষা না পান, তবে তা জনআস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ জরুরি।
শাহবাগ থানায় সাংবাদিকরা যে অভিযোগ তুলেছেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে দ্রুত মামলা গ্রহণ এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সংবাদ পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শক্তি। সাংবাদিকদের ভয়ভীতি বা হামলার মধ্যে কাজ করতে হলে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও দ্রুত পদক্ষেপ অপরিহার্য।
সব মিলিয়ে শাহবাগ থানায় সাংবাদিকরা হামলার বিচার চাইতে গিয়ে নতুন ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। মামলা নিতে গড়িমসির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এখন দ্রুত মামলা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা প্রশাসনের বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।






















