ঢাকা ১০:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেনাপ্রধানের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই সাক্ষাৎ কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিকও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়ন ও শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হিসেবে পরিচিত। ফলে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর হলে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের এই সাক্ষাৎ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প খাতের সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বৈঠকে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

প্রধান উপদেষ্টা এ সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করবে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। দুই দেশের মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন শিল্প উপকরণের বাণিজ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সৌজন্য সাক্ষাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) অথবা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) নিয়ে ভবিষ্যতে আরও অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং হালকা প্রকৌশল খাতে কোরিয়ান বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশে শিল্পপার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রদূত জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে আগ্রহী এবং অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আরও সহজ হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দক্ষিণ কোরিয়া তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট সিটি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি।

সাক্ষাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রমে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা গেলে উভয় দেশই উপকৃত হবে।

বৈঠকে শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। বর্তমানে বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।

রাষ্ট্রদূত জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উন্নত প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গবেষণাক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন শিল্প খাতে বিদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে।

রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের মান উন্নত হলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে আরও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের শ্রমবাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হওয়ায় এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বৈঠকে পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা আলোচনা করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়া পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও সবুজ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

প্রধান উপদেষ্টা জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। রাষ্ট্রদূতও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের চলমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচির বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। সড়ক, রেল, বন্দর, জ্বালানি এবং নগর উন্নয়ন খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সফলতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন।

দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, টেকসই উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সংলাপের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সবসময় শান্তি, উন্নয়ন ও সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক গত কয়েক দশকে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে এই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

সাম্প্রতিক এই সৌজন্য সাক্ষাৎ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে নতুন নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রযুক্তি ও শিল্পসমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, এই বৈঠকের আলোচনাগুলো ভবিষ্যতে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ নেবে এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সেনাপ্রধানের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

Update Time : ০৮:৩৮:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই সাক্ষাৎ কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিকও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়ন ও শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হিসেবে পরিচিত। ফলে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর হলে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের এই সাক্ষাৎ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প খাতের সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বৈঠকে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

প্রধান উপদেষ্টা এ সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করবে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। দুই দেশের মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন শিল্প উপকরণের বাণিজ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আরও পড়ুন  দিল্লি সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে বৈঠক

সৌজন্য সাক্ষাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) অথবা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) নিয়ে ভবিষ্যতে আরও অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং হালকা প্রকৌশল খাতে কোরিয়ান বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশে শিল্পপার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রদূত জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে আগ্রহী এবং অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আরও সহজ হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দক্ষিণ কোরিয়া তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট সিটি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি।

সাক্ষাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রমে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা গেলে উভয় দেশই উপকৃত হবে।

বৈঠকে শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। বর্তমানে বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।

আরও পড়ুন  চীনের সঙ্গে আরো গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

রাষ্ট্রদূত জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উন্নত প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গবেষণাক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন শিল্প খাতে বিদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে।

রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের মান উন্নত হলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে আরও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের শ্রমবাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হওয়ায় এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বৈঠকে পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা আলোচনা করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়া পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও সবুজ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

প্রধান উপদেষ্টা জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। রাষ্ট্রদূতও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের চলমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচির বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। সড়ক, রেল, বন্দর, জ্বালানি এবং নগর উন্নয়ন খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সফলতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন  পুঁজিবাজার সংস্কার: বড় উদ্যোগের তথ্য জানালেন অর্থমন্ত্রী

প্রধান উপদেষ্টা উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন।

দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, টেকসই উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সংলাপের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সবসময় শান্তি, উন্নয়ন ও সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক গত কয়েক দশকে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে এই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

সাম্প্রতিক এই সৌজন্য সাক্ষাৎ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে নতুন নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রযুক্তি ও শিল্পসমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, এই বৈঠকের আলোচনাগুলো ভবিষ্যতে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ নেবে এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।