চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে একটি ছোট স্পোর্টস উড়োজাহাজ আকাশচুম্বী ভবনে আছড়ে পড়ার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট হয়নি। দুর্ঘটনায় পাইলট নিহত এবং মাটিতে থাকা অন্তত ১৩ জন আহত হন। তদন্ত চললেও কর্তৃপক্ষ এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, ফলে ঘটনাটি ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়েছে।
গত ২৬ জুন স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে এক ইঞ্জিনের দুই আসনবিশিষ্ট একটি ছোট উড়োজাহাজ বেইজিংয়ের পূর্ব থার্ড রিং রোডের কাছে একটি সুউচ্চ ভবনে আঘাত হানে। দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিলেও কীভাবে উড়োজাহাজটি রাজধানীর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় প্রবেশ করল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
চীনের রাজধানীর আকাশসীমা দেশটির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। এমন এলাকায় একটি ব্যক্তিগত স্পোর্টস উড়োজাহাজের প্রবেশ এবং পরে একটি ভবনে আঘাত হানার ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
কর্তৃপক্ষ প্রথমদিকে ভবনটির নাম প্রকাশ না করলেও ছবি, ভিডিও এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স নিশ্চিত করেছে, উড়োজাহাজটি বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবন সিআইটিআইসি টাওয়ারে আঘাত করেছিল। ‘চায়না জুন’ নামেও পরিচিত এই ভবনটির উচ্চতা প্রায় ৫২৮ মিটার এবং এটি রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত।
দুর্ঘটনার পর প্রকাশিত ছবিতে ভবনের ওপরের অংশে কাচের দেয়াল ভেঙে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। ভবনের বাইরের দুটি বড় প্যানেল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ভবনের ভেতরে কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে বা কোনো কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উড়োজাহাজটি রাডার থেকে অদৃশ্য হওয়ার আগে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় উড়ছিল। সেই হিসেবে এটি সিআইটিআইসি টাওয়ারের ছাদের চেয়ে প্রায় এক হাজার ফুট ওপরে ছিল। ফলে কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে ভবনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাডারে উড়োজাহাজটির সর্বশেষ অবস্থান টাওয়ার থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যে সময় দুর্ঘটনার কথা জানিয়েছে এবং ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্যের মধ্যে সময়গত অমিল রয়েছে। এই অসঙ্গতি তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উড়োজাহাজটির শেষ রেকর্ড করা গতি বিবেচনায় নিলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব ছিল। তবে সরকারি সময়সূচি ও ফ্লাইট ডেটার মধ্যে পার্থক্যের কারণ সম্পর্কে বেইজিং কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি।
দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক দিন কর্তৃপক্ষ শুধু জানিয়েছিল, উড়োজাহাজে একজন পাইলট ছিলেন এবং তিনি নিহত হয়েছেন। তবে তাঁর পরিচয়, অভিজ্ঞতা বা ফ্লাইটের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। প্রায় এক সপ্তাহ পর পাইলটের পরিচয় প্রকাশ করা হয়।
চাওইয়াং জেলার প্রশাসন জানায়, নিহত পাইলটের বয়স ছিল ৬৬ বছর এবং তাঁর পারিবারিক নাম ‘লিউ’। সরকারি বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রা ও হতাশায় ভুগছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে একাধিকবার আত্মহত্যার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, লিউ অনুমোদিত আকাশসীমা থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন এবং পরে সিআইটিআইসি টাওয়ারে আঘাত করেন। দুর্ঘটনার আগে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো অতিরিক্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
দুর্ঘটনায় জড়িত উড়োজাহাজটি ছিল চীনে তৈরি দুই আসনের ‘সানওয়ার্ড অরোরা এসএ৬০এল’ মডেলের একটি স্পোর্টস বিমান। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এটি স্বল্প উচ্চতায় উড্ডয়নের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এর সর্বনিম্ন উড্ডয়ন গতি ঘণ্টায় ৭২ কিলোমিটার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাবশেষের ছবিতে উড়োজাহাজটির ‘বি-১২পিপি’ নিবন্ধন নম্বর দেখা গেছে। প্রচারমূলক তথ্য অনুযায়ী, এটি সম্ভবত বেইজিংভিত্তিক একটি সাধারণ বিমান চলাচল প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এই দুর্ঘটনা চীনের দ্রুত সম্প্রসারণশীল স্বল্প উচ্চতার বিমান চলাচল খাতের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। জানা গেছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েকটি পর্যটন ফ্লাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে তাদের সেবা স্থগিত রেখেছে। নতুন কোনো বিধিনিষেধ আসতে পারে কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার ঠিক আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নজরে এসেছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে হাইনান এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুটি উড়োজাহাজের উচ্চতার ব্যবধান তখন মাত্র এক হাজার ফুটের কিছু বেশি ছিল। ঠিক সেই সময় হাইনান এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটি হঠাৎ উচ্চতা বাড়িয়ে ফেলে এবং অবতরণের পরিবর্তে উড্ডয়নের পথ পরিবর্তন করে। এ সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে বিমানবন্দর বা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
দুর্ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন তুলছেন চীনের সাধারণ নাগরিকরা। তবে বেইজিং কর্তৃপক্ষের অনলাইন বিবৃতির নিচে করা অনেক মন্তব্য দ্রুত মুছে ফেলা হচ্ছে। ফলে এই দুর্ঘটনা কেবল একটি বিমান দুর্ঘটনা নয়, বরং তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা ও আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেইজিংয়ের এই রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের শেষ হচ্ছে না।




























