ঢাকা ১১:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর কী বদল আনতে হবে?

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে ব্রাজিলকে

ব্রাজিলের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়েছে প্রত্যাশার অনেক আগেই। শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কার্লো আনচেলত্তির মতো কিংবদন্তি কোচ এবং একঝাঁক তারকা ফুটবলার নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষে ফিরতে ব্রাজিলকে ঠিক কী করতে হবে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলকে অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবে দেখা হয়েছিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগোসহ ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে খেলা তারকাদের নিয়ে গড়া স্কোয়াড থেকে সমর্থকদের প্রত্যাশাও ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

২০০২ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রায় ২৫ বছর কেটে গেলেও ব্রাজিল আর কোনো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে পারেনি। এই দীর্ঘ অপেক্ষা ফুটবলপ্রেমীদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এবার শুধু বিদায় নয়, দলের সামগ্রিক কাঠামো নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলোয়াড়ের অভাব নয়, বরং দলগত সমন্বয়ের ঘাটতি। ব্যক্তিগত দক্ষতায় ভরপুর ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একক ইউনিট হিসেবে খেলতে পারেনি। আধুনিক ফুটবলে কেবল প্রতিভা নয়, সুসংগঠিত কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রাজিলের সোনালি সময়ের দলগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৯৪ কিংবা ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াডে প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতেন। শৈল্পিক ফুটবলের পাশাপাশি কৌশলগত শৃঙ্খলাও ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচেও ব্রাজিল কয়েকবার আক্রমণে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। তবে পুরো ম্যাচে আধিপত্য ধরে রাখতে পারেনি তারা। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই বিভাগেই সমন্বয়ের অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিশেষ করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো ব্রাজিলের অন্যতম বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে মিডফিল্ডই ম্যাচের গতি নির্ধারণ করে। বলের দখল, প্রেসিং এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে নকআউট ম্যাচে সফল হওয়া কঠিন।

ব্রাজিলের টেকনিক্যাল দক্ষতার অভাব নেই। কিন্তু তাদের এমন মিডফিল্ডার প্রয়োজন, যারা চাপের মধ্যেও খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে বল হারানোর পর দ্রুত রক্ষণে নেমে প্রতিপক্ষের আক্রমণও ঠেকাতে হবে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারে নতুন প্রজন্মের মিডফিল্ডাররা। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলা তরুণ ফুটবলাররা ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রতিভার জানান দিচ্ছেন। সঠিক পরিকল্পনায় তাদের গড়ে তুলতে পারলে দলটি আবারও বিশ্বসেরাদের কাতারে ফিরতে পারে।

এদিকে, বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর কার্লো আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একটি টুর্নামেন্টের ফল দেখে তার ওপর আস্থা হারানো উচিত হবে না বলেই মনে করছেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক। ক্লাব ফুটবলে তার সাফল্যের ইতিহাস এখনও তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাস্তবতা অবশ্য ক্লাব ফুটবলের চেয়ে ভিন্ন। জাতীয় দলের কোচরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খুব অল্প সময় কাজ করার সুযোগ পান। ফলে জটিল কৌশল মাঠে বাস্তবায়ন করতে সময় ও ধারাবাহিকতা দুটোই প্রয়োজন হয়।

সেই কারণেই আনচেলত্তির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখাই হতে পারে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত। প্রতিটি ব্যর্থতার পর কোচ পরিবর্তনের সংস্কৃতি সাধারণত স্থায়ী সাফল্য এনে দেয় না। বরং একই পরিকল্পনা ধরে রেখে ধীরে ধীরে উন্নতি করাই বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।

আগামী দিনের ব্রাজিল দল গঠনে তরুণদের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আক্রমণের মূল ভরসা হিসেবেই থাকবেন। তার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের ধীরে ধীরে বড় মঞ্চে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত করতে হবে।

তবে শুধু তরুণদের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের উপস্থিতিও সমান জরুরি। নকআউট ম্যাচের চাপ সামলানো, কঠিন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অভিজ্ঞদের বিকল্প নেই।

সবশেষে ব্রাজিলকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতার দিকে। বড় ম্যাচে হাতে গোনা কয়েকটি সুযোগই ফল নির্ধারণ করে দেয়। দলগত সমন্বয়, শক্তিশালী মিডফিল্ড, তরুণ-অভিজ্ঞদের ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ব্রাজিল আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে ফেরার স্বপ্ন দেখতেই পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর কী বদল আনতে হবে?

Update Time : ০৮:২৫:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

ব্রাজিলের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়েছে প্রত্যাশার অনেক আগেই। শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কার্লো আনচেলত্তির মতো কিংবদন্তি কোচ এবং একঝাঁক তারকা ফুটবলার নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষে ফিরতে ব্রাজিলকে ঠিক কী করতে হবে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলকে অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবে দেখা হয়েছিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগোসহ ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে খেলা তারকাদের নিয়ে গড়া স্কোয়াড থেকে সমর্থকদের প্রত্যাশাও ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

২০০২ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রায় ২৫ বছর কেটে গেলেও ব্রাজিল আর কোনো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে পারেনি। এই দীর্ঘ অপেক্ষা ফুটবলপ্রেমীদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এবার শুধু বিদায় নয়, দলের সামগ্রিক কাঠামো নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলোয়াড়ের অভাব নয়, বরং দলগত সমন্বয়ের ঘাটতি। ব্যক্তিগত দক্ষতায় ভরপুর ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একক ইউনিট হিসেবে খেলতে পারেনি। আধুনিক ফুটবলে কেবল প্রতিভা নয়, সুসংগঠিত কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন  ৭-১-এর পর সবচেয়ে বাজে ৪৫ মিনিট? ব্রাজিলকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা

ব্রাজিলের সোনালি সময়ের দলগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৯৪ কিংবা ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াডে প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতেন। শৈল্পিক ফুটবলের পাশাপাশি কৌশলগত শৃঙ্খলাও ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচেও ব্রাজিল কয়েকবার আক্রমণে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। তবে পুরো ম্যাচে আধিপত্য ধরে রাখতে পারেনি তারা। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই বিভাগেই সমন্বয়ের অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিশেষ করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো ব্রাজিলের অন্যতম বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে মিডফিল্ডই ম্যাচের গতি নির্ধারণ করে। বলের দখল, প্রেসিং এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে নকআউট ম্যাচে সফল হওয়া কঠিন।

ব্রাজিলের টেকনিক্যাল দক্ষতার অভাব নেই। কিন্তু তাদের এমন মিডফিল্ডার প্রয়োজন, যারা চাপের মধ্যেও খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে বল হারানোর পর দ্রুত রক্ষণে নেমে প্রতিপক্ষের আক্রমণও ঠেকাতে হবে।

আরও পড়ুন  রাফিনিয়ার চোটে দুশ্চিন্তায় ব্রাজিল, মুখ খুললেন আনচেলত্তি

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারে নতুন প্রজন্মের মিডফিল্ডাররা। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলা তরুণ ফুটবলাররা ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রতিভার জানান দিচ্ছেন। সঠিক পরিকল্পনায় তাদের গড়ে তুলতে পারলে দলটি আবারও বিশ্বসেরাদের কাতারে ফিরতে পারে।

এদিকে, বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর কার্লো আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একটি টুর্নামেন্টের ফল দেখে তার ওপর আস্থা হারানো উচিত হবে না বলেই মনে করছেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক। ক্লাব ফুটবলে তার সাফল্যের ইতিহাস এখনও তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাস্তবতা অবশ্য ক্লাব ফুটবলের চেয়ে ভিন্ন। জাতীয় দলের কোচরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খুব অল্প সময় কাজ করার সুযোগ পান। ফলে জটিল কৌশল মাঠে বাস্তবায়ন করতে সময় ও ধারাবাহিকতা দুটোই প্রয়োজন হয়।

সেই কারণেই আনচেলত্তির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখাই হতে পারে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত। প্রতিটি ব্যর্থতার পর কোচ পরিবর্তনের সংস্কৃতি সাধারণত স্থায়ী সাফল্য এনে দেয় না। বরং একই পরিকল্পনা ধরে রেখে ধীরে ধীরে উন্নতি করাই বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।

আরও পড়ুন  নেইমারের চোটে উদ্বেগ, প্রস্তুতি ম্যাচে খেলছেন না ব্রাজিল তারকা

আগামী দিনের ব্রাজিল দল গঠনে তরুণদের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আক্রমণের মূল ভরসা হিসেবেই থাকবেন। তার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের ধীরে ধীরে বড় মঞ্চে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত করতে হবে।

তবে শুধু তরুণদের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের উপস্থিতিও সমান জরুরি। নকআউট ম্যাচের চাপ সামলানো, কঠিন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অভিজ্ঞদের বিকল্প নেই।

সবশেষে ব্রাজিলকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতার দিকে। বড় ম্যাচে হাতে গোনা কয়েকটি সুযোগই ফল নির্ধারণ করে দেয়। দলগত সমন্বয়, শক্তিশালী মিডফিল্ড, তরুণ-অভিজ্ঞদের ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ব্রাজিল আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে ফেরার স্বপ্ন দেখতেই পারে।