মস্তিষ্কে সিস্ট (Brain Cyst) মানেই ক্যানসার—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অধিকাংশ ব্রেন সিস্টই নিরীহ (Benign) এবং অনেক মানুষ সারাজীবন কোনো উপসর্গ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। তবে সিস্টের আকার বড় হলে বা এটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে চাপ সৃষ্টি করলে মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, ভারসাম্য হারানো, বমি কিংবা খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ব্রেন সিস্ট কী?
ব্রেন সিস্ট বা মস্তিষ্কের সিস্ট হলো মস্তিষ্কের ভেতরে তৈরি হওয়া তরলপূর্ণ একটি থলি। এতে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF), রক্ত, পুঁজ অথবা অন্য ধরনের তরল থাকতে পারে।
বেশিরভাগ ব্রেন সিস্ট ক্যানসার নয় এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না। তবে অবস্থান ও আকারের ওপর নির্ভর করে এটি নানা জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
কেন হয় ব্রেন সিস্ট?
ব্রেন সিস্ট হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন—
- জন্মগতভাবে ভ্রূণের বিকাশের সময় তৈরি হওয়া
- মাথায় গুরুতর আঘাত লাগা
- মস্তিষ্কে সংক্রমণ
- ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা পরজীবীর সংক্রমণ
- কিছু ক্ষেত্রে ব্রেন টিউমারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে
ব্রেন সিস্টের সাধারণ লক্ষণ
সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
- বারবার বা দীর্ঘদিন ধরে মাথাব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- মাথা ঘোরা (ভার্টিগো)
- দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া বা কমে যাওয়া
- শুনতে সমস্যা হওয়া
- হাঁটতে বা ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা
- মুখে ব্যথা বা অস্বস্তি
- খিঁচুনি হওয়া
- হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অসাড়তা
ব্রেন সিস্টের বিভিন্ন ধরন
চিকিৎসকদের মতে, ব্রেন সিস্টের একাধিক ধরন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- অ্যারাকনয়েড সিস্ট: মস্তিষ্ক ও অ্যারাকনয়েড মেমব্রেনের মাঝখানে তৈরি হয়।
- কোলয়েড সিস্ট: জেল জাতীয় পদার্থে ভরা থাকে এবং সাধারণত মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকলে দেখা যায়।
- ডার্ময়েড সিস্ট: জন্মগত বিরল সিস্ট।
- এপিডারময়েড সিস্ট: ভ্রূণের বিকাশের সময় আটকে থাকা টিস্যু থেকে তৈরি হয়।
- পিনিয়াল সিস্ট: মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থিতে তৈরি হয় এবং অনেক সময় অন্য কারণে করা স্ক্যানে ধরা পড়ে।
- ব্রেন অ্যাবসেস: সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া পুঁজভর্তি সিস্ট।
- নিওপ্লাস্টিক সিস্ট: কিছু টিউমারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
অনেক সময় অন্য কোনো সমস্যার জন্য করা ব্রেন স্ক্যানেই ব্রেন সিস্ট ধরা পড়ে। আবার উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
সাধারণত যেসব পরীক্ষা করা হয়—
- সিটি (CT) স্ক্যান
- এমআরআই (MRI) স্ক্যান
এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে সিস্টের অবস্থান, আকার এবং আশপাশের টিস্যুর ওপর প্রভাব নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
চিকিৎসা কী?
ব্রেন সিস্টের চিকিৎসা নির্ভর করে এর ধরন, আকার এবং রোগীর উপসর্গের ওপর।
- ছোট এবং উপসর্গহীন সিস্ট হলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
- নির্দিষ্ট সময় পরপর ব্রেন স্ক্যান করা হয়।
- সিস্ট বড় হলে বা মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
- সংক্রমণজনিত সিস্ট হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে নিউরোলজিস্ট বা নিউরোসার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা
- বারবার বমি হওয়া
- দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া
- হাঁটতে বা ভারসাম্য রাখতে সমস্যা
- হাত-পায়ে অসাড়তা বা ঝিনঝিনি
- ঘন ঘন খিঁচুনি
- মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা
ব্রেন সিস্ট কি সবসময় বিপজ্জনক?
না। অধিকাংশ ব্রেন সিস্ট নিরীহ এবং চিকিৎসার প্রয়োজনও হয় না। তবে সিস্টের আকার বাড়লে, মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে চাপ সৃষ্টি করলে বা উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রয়োজন। তাই দীর্ঘদিন মাথাব্যথা, খিঁচুনি, ভারসাম্য হারানো কিংবা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।




























