ঢাকা ০৪:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুপুরে ভাতঘুমে কি সত্যিই বাড়ে ব্লাড সুগার? কতক্ষণ ঘুম নিরাপদ, জানালেন বিশেষজ্ঞ

দুপুরের স্বল্প সময়ের পাওয়ার ন্যাপ শরীরকে চাঙা রাখে, তবে দীর্ঘক্ষণ ভাতঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

দুপুরে পেট ভরে ভাত খাওয়ার পর অনেকেরই চোখে ঘুম নেমে আসে। তাই সুযোগ পেলেই একটু ভাতঘুম দেন। তবে এই অভ্যাস কি শরীরের জন্য ভালো, নাকি উল্টো রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে? বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরে অল্প সময়ের ঘুম শরীরের জন্য উপকারী হলেও ৩০ মিনিটের বেশি ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ ভাতঘুম হজমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি, এমনকি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও বাড়াতে পারে।

কেন দুপুরে ভাত খাওয়ার পর ঘুম পায়?

ভাতে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা থাকে। খাবার হজম হওয়ার পর এই শর্করা গ্লুকোজে পরিণত হয়। গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে শরীরে ইনসুলিনের নিঃসরণ বাড়ে। ইনসুলিনের প্রভাবে ট্রিপটোফ্যান নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্কে সহজে প্রবেশ করে, যা পরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে। এই দুই হরমোন শরীরে ঘুমের অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়।

দুপুরে ঘুমের উপকারিতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময় ও সীমিত পরিমাণে দুপুরের ঘুম শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে যারা রাতে পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না বা রাতের শিফটে কাজ করেন, তাদের জন্য ছোট্ট একটি পাওয়ার ন্যাপ কার্যকর।

১৫ থেকে ৩০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপের উপকারিতা:

  • শারীরিক ক্লান্তি কমায়।
  • মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়ায়।
  • স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।
  • কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
  • মানসিক চাপ কমিয়ে মেজাজ ভালো রাখে।
  • বিকেলের কাজের জন্য নতুন উদ্যম এনে দেয়।

কতক্ষণ ঘুম নিরাপদ?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমানো উচিত নয়। এই সময়ের মধ্যে ঘুমালে শরীর বিশ্রাম পায়, কিন্তু গভীর ঘুমে প্রবেশ করে না। ফলে ঘুম ভাঙার পরও সতেজ অনুভূত হয়।

৩০ মিনিটের বেশি ঘুমালে কী হতে পারে?

দীর্ঘ সময় ধরে দুপুরে ঘুমানোর ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৩০ মিনিটের বেশি ভাতঘুমের সম্ভাব্য ক্ষতি:

  • রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
  • শরীরে অতিরিক্ত ওজন জমার ঝুঁকি বাড়ে।
  • হজমের সমস্যা হতে পারে।
  • রাতের স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হয়।
  • ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘ সময় ঝিমুনি বা ক্লান্তি অনুভূত হয়।
  • কাজে মনোযোগ কমে যায়।

‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ কী?

বিশেষজ্ঞরা জানান, দুপুরে দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে অনেকেই ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ নামের একটি অবস্থার শিকার হন। এ সময় ঘুম থেকে ওঠার পরও মাথা ভার লাগা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, অলসতা এবং কাজে অনীহা দেখা দেয়। এই অবস্থা কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ কী বলছেন?

পূর্ব মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আয়ুষ দফতরের আধিকারিক ডা. প্রকাশ হাজরা বলেন, রাতে যদি স্বাভাবিকভাবে পর্যাপ্ত ঘুম হয়, তাহলে দুপুরে ঘুমানোর বিশেষ প্রয়োজন নেই। তবে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপ শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।

তার মতে, দীর্ঘ সময় দুপুরে ঘুমালে—

  • হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে।
  • ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে।
  • শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়।

কারা দুপুরে ঘুমাতে পারেন?

নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের দুপুরের ঘুম উপকারী হতে পারে—

  • যারা রাতের শিফটে কাজ করেন।
  • যাদের রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না।
  • অতিরিক্ত মানসিক বা শারীরিক পরিশ্রম করেন।
  • বয়স্ক ব্যক্তি, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

তবে ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা ঘুমের সমস্যায় ভুগলে নিয়মিত দীর্ঘ সময় ভাতঘুমের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুস্থ থাকতে যা করবেন

  • দুপুরে ঘুমালে ১৫–৩০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন।
  • খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় না গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটুন।
  • অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • রাতে ৭–৮ ঘণ্টা নিয়মিত ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।

দুপুরের ভাতঘুম পুরোপুরি ক্ষতিকর নয়। বরং সঠিক সময় ও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নেওয়া একটি ছোট্ট পাওয়ার ন্যাপ শরীর ও মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। তবে ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমানোর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করা বৃদ্ধি, ওজন বাড়া এবং হজমের সমস্যাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই দুপুরে ঘুমাতে চাইলে সময়ের দিকে বিশেষ নজর দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুপুরে ভাতঘুমে কি সত্যিই বাড়ে ব্লাড সুগার? কতক্ষণ ঘুম নিরাপদ, জানালেন বিশেষজ্ঞ

Update Time : ০২:২০:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

দুপুরে পেট ভরে ভাত খাওয়ার পর অনেকেরই চোখে ঘুম নেমে আসে। তাই সুযোগ পেলেই একটু ভাতঘুম দেন। তবে এই অভ্যাস কি শরীরের জন্য ভালো, নাকি উল্টো রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে? বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরে অল্প সময়ের ঘুম শরীরের জন্য উপকারী হলেও ৩০ মিনিটের বেশি ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ ভাতঘুম হজমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি, এমনকি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও বাড়াতে পারে।

কেন দুপুরে ভাত খাওয়ার পর ঘুম পায়?

ভাতে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা থাকে। খাবার হজম হওয়ার পর এই শর্করা গ্লুকোজে পরিণত হয়। গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে শরীরে ইনসুলিনের নিঃসরণ বাড়ে। ইনসুলিনের প্রভাবে ট্রিপটোফ্যান নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্কে সহজে প্রবেশ করে, যা পরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে। এই দুই হরমোন শরীরে ঘুমের অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়।

দুপুরে ঘুমের উপকারিতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময় ও সীমিত পরিমাণে দুপুরের ঘুম শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে যারা রাতে পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না বা রাতের শিফটে কাজ করেন, তাদের জন্য ছোট্ট একটি পাওয়ার ন্যাপ কার্যকর।

আরও পড়ুন  হাসছেন ঠিকই, কিন্তু ভিতরে চাপ? চিনে নিন সাইলেন্ট স্ট্রেস

১৫ থেকে ৩০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপের উপকারিতা:

  • শারীরিক ক্লান্তি কমায়।
  • মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়ায়।
  • স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।
  • কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
  • মানসিক চাপ কমিয়ে মেজাজ ভালো রাখে।
  • বিকেলের কাজের জন্য নতুন উদ্যম এনে দেয়।

কতক্ষণ ঘুম নিরাপদ?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমানো উচিত নয়। এই সময়ের মধ্যে ঘুমালে শরীর বিশ্রাম পায়, কিন্তু গভীর ঘুমে প্রবেশ করে না। ফলে ঘুম ভাঙার পরও সতেজ অনুভূত হয়।

৩০ মিনিটের বেশি ঘুমালে কী হতে পারে?

দীর্ঘ সময় ধরে দুপুরে ঘুমানোর ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৩০ মিনিটের বেশি ভাতঘুমের সম্ভাব্য ক্ষতি:

  • রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
  • শরীরে অতিরিক্ত ওজন জমার ঝুঁকি বাড়ে।
  • হজমের সমস্যা হতে পারে।
  • রাতের স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হয়।
  • ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘ সময় ঝিমুনি বা ক্লান্তি অনুভূত হয়।
  • কাজে মনোযোগ কমে যায়।
আরও পড়ুন  আখের রস উপকারী, কিন্তু সবার জন্য নয়—এই ৬ জন অবশ্যই সাবধান

‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ কী?

বিশেষজ্ঞরা জানান, দুপুরে দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে অনেকেই ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ নামের একটি অবস্থার শিকার হন। এ সময় ঘুম থেকে ওঠার পরও মাথা ভার লাগা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, অলসতা এবং কাজে অনীহা দেখা দেয়। এই অবস্থা কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ কী বলছেন?

পূর্ব মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আয়ুষ দফতরের আধিকারিক ডা. প্রকাশ হাজরা বলেন, রাতে যদি স্বাভাবিকভাবে পর্যাপ্ত ঘুম হয়, তাহলে দুপুরে ঘুমানোর বিশেষ প্রয়োজন নেই। তবে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপ শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।

তার মতে, দীর্ঘ সময় দুপুরে ঘুমালে—

  • হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে।
  • ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে।
  • শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়।

কারা দুপুরে ঘুমাতে পারেন?

নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের দুপুরের ঘুম উপকারী হতে পারে—

  • যারা রাতের শিফটে কাজ করেন।
  • যাদের রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না।
  • অতিরিক্ত মানসিক বা শারীরিক পরিশ্রম করেন।
  • বয়স্ক ব্যক্তি, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
আরও পড়ুন  টাটকা ইলিশ-চিংড়ি চিনবেন যেভাবে, জেনে নিন সহজ উপায়

তবে ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা ঘুমের সমস্যায় ভুগলে নিয়মিত দীর্ঘ সময় ভাতঘুমের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুস্থ থাকতে যা করবেন

  • দুপুরে ঘুমালে ১৫–৩০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন।
  • খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় না গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটুন।
  • অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • রাতে ৭–৮ ঘণ্টা নিয়মিত ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।

দুপুরের ভাতঘুম পুরোপুরি ক্ষতিকর নয়। বরং সঠিক সময় ও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নেওয়া একটি ছোট্ট পাওয়ার ন্যাপ শরীর ও মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। তবে ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমানোর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করা বৃদ্ধি, ওজন বাড়া এবং হজমের সমস্যাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই দুপুরে ঘুমাতে চাইলে সময়ের দিকে বিশেষ নজর দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।