দেশে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছেই। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৭৮৬ জনের শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
শনিবার (১১ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হলেও পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে নতুন কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত এবং উপসর্গজনিত উভয় ধরনের মৃত্যুর তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় চিকিৎসকরা অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৪ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে আরও ৭০২ জনের মধ্যে হামের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা গেছে। ফলে একদিনেই মোট ৭৮৬ জন নতুন রোগী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৬০১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষায় মোট ১৩ হাজার ৪১০ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, দেশে সংক্রমণের বিস্তার এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও পরিস্থিতির গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৩ হাজার ৪৯১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৮৯ হাজার ৭৬২ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে সময়মতো টিকা না নেওয়া, অপুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা গ্রহণ।
চিকিৎসকরা জানান, হামের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, শরীরে লালচে র্যাশ, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং দুর্বলতা। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা উচিত। চিকিৎসায় দেরি হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশুদের টিকাদান সম্পন্ন করতে হবে এবং কোনো শিশুর জ্বর বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে, যাতে সংক্রমণ আরও না ছড়ায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদান কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ নিশ্চিত করাও জরুরি।
দেশজুড়ে হাম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতাই হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।




























