কোনো কোনো শিশু একটু বেশি ঘামে, বিশেষ করে ঘুমের সময় তাদের মাথা, বালিশ কিংবা বিছানা পর্যন্ত ভিজে যেতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে অনেক বাবা-মা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ঘাম সবসময় অসুস্থতার লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ। তবে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিলে অতিরিক্ত ঘাম কোনো অন্তর্নিহিত রোগের ইঙ্গিতও হতে পারে।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারাহ দোলার মতে, শিশুদের ঘর্মগ্রন্থি বা ঘাম উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত থাকে না। বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়ের অংশের ঘর্মগ্রন্থি শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি সক্রিয় থাকে। এ কারণে ঘুমের সময় কিংবা খেলাধুলার পর শিশুদের মাথা বেশি ঘেমে যেতে পারে।
গভীর ঘুমের সময় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কারণেও শিশুদের ঘাম হতে পারে। এছাড়া গরম আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বাতাস না থাকা, অতিরিক্ত মোটা কাপড় পরানো বা একাধিক স্তরের পোশাক পরিয়ে রাখলেও শিশুর শরীরে ঘাম বেশি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে কখনো কখনো অতিরিক্ত ঘাম একটি চিকিৎসাজনিত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘হাইপারহাইড্রোসিস’। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি ঘাম তৈরি হয়। অনেক সময় গরম আবহাওয়া বা শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই শিশুর শরীর অতিরিক্ত ঘামে ভিজে যায়।
বিশেষজ্ঞরা হাইপারহাইড্রোসিসকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করেন। প্রথমটি হলো ‘প্রাইমারি ফোকাল হাইপারহাইড্রোসিস’, যা সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বংশগত হয়ে থাকে। এতে হাতের তালু, পায়ের পাতা, মাথা, মুখ বা বগলে বেশি ঘাম হয়। অন্যদিকে ‘সেকেন্ডারি হাইপারহাইড্রোসিস’ কোনো রোগ, শারীরিক জটিলতা বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুরো শরীর ঘেমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
শিশুর অতিরিক্ত ঘামের পেছনে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে। থাইরয়েড হরমোনের অস্বাভাবিক ক্ষরণ, জন্মগত হৃদরোগ, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ভিটামিন-ডির ঘাটতি কিংবা স্নায়বিক সমস্যার কারণে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এছাড়া মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা অস্থিরতাও শিশুদের ঘাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
যে লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন
- পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- হাত ও পায়ের তালু সবসময় ভেজা থাকা
- জামাকাপড় বা মোজা দ্রুত ভিজে যাওয়া
- ঘামের কারণে দুর্গন্ধ তৈরি হওয়া
- খাওয়ার সময় অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- অল্পতেই দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাসকষ্ট হওয়া
- শিশুর ওজন না বাড়া বা হঠাৎ কমে যাওয়া
- ঠান্ডা বা স্বাভাবিক পরিবেশেও শরীর ঘেমে ভিজে যাওয়া
- ঘামের কারণে ঘুমের সমস্যা বা অতিরিক্ত বিরক্তি দেখা দেওয়া
চিকিৎসকদের মতে, এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা গেলে দেরি না করে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সময়মতো কারণ শনাক্ত করা গেলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
শিশুর অতিরিক্ত ঘাম হলে করণীয়
- শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় পরানো থেকে বিরত থাকুন
- ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন
- নিয়মিত শিশুর শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করুন
- পর্যাপ্ত বুকের দুধ, পানি ও তরল খাবার দিন
- ঘামের কারণে পানিশূন্যতা হচ্ছে কি না খেয়াল রাখুন
- ঘাম অস্বাভাবিক মনে হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ঘাম হওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক একটি শারীরিক প্রক্রিয়া। তবে অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে যদি শ্বাসকষ্ট, ওজন কমে যাওয়া বা খাওয়ার সময় ঘামার মতো লক্ষণ যুক্ত হয়, তাহলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা শিশুকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



























