নগদ অর্থ বা ব্যাংকিং চ্যানেল নয়, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পণ্যের লেনদেনে ভয়ংকর এক নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে। রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া চাল, ডাল, তেল, লবণ, ওষুধ, শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) দিয়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষায় এই পদ্ধতি এখন পরিচিত হচ্ছে ‘নার্কো-কারেন্সি’ (Narco-Currency) বা মাদক-মুদ্রা নামে।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিশেষ করে আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। দীর্ঘদিনের এই সংঘর্ষে বহু সড়ক, বাজার ও ব্যাংকিং কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। ফলে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হয় এবং সীমান্ত এলাকায় বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন স্বর্ণ, জ্বালানি বা মাদকের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য অনেক সময় বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাখাইনের কিছু এলাকায় এখন সেই ভূমিকাই পালন করছে ইয়াবা ও আইস।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশ থেকে খাদ্যপণ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মিয়ানমারে প্রবেশ করছে। এর বিনিময়ে পাচারকারীরা নগদ অর্থের পরিবর্তে পাচ্ছে ইয়াবার চালান বা আইস।
এরপর সেই মাদক বিভিন্ন চোরাচালান রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশে ঢুকছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে এসব মাদক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদ্ধতির ফলে পাচারকারীদের নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার নজরদারি এড়িয়ে সহজেই সীমান্ত বাণিজ্য চালানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে মাদক পাচার আরও লাভজনক ও সংগঠিত হয়ে উঠছে।
এ ধরনের লেনদেন শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলেও দেখা গেছে। যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে, সেখানে অবৈধ পণ্যই অনেক সময় বিকল্প মুদ্রায় পরিণত হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, দেশে সরাসরি ইয়াবা বা আইস উৎপাদন না হলেও সীমান্ত দিয়ে আসা এসব মাদকই দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। যদিও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্নতা রয়েছে।
বিশেষ করে ইয়াবা ও আইস তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ছে। অপরাধ বৃদ্ধি, পারিবারিক অস্থিরতা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যাও বাড়ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে যদি নার্কো-কারেন্সি ভিত্তিক এই লেনদেন অব্যাহত থাকে, তাহলে এটি শুধু মাদক পাচারই নয়, অস্ত্র পাচার, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রকেও আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তারা সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা, সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন—
- সীমান্তে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি।
- বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বিত অভিযান।
- সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সচেতনতা বৃদ্ধি।
- আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় জোরদার।
- মাদক পাচারের অর্থায়ন ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সীমান্ত এলাকায় মাদক এখন শুধু একটি অবৈধ পণ্য নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে বিনিময় মাধ্যম বা ‘মুদ্রা’ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।


























