ঢাকা ০২:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবাধিকার আইন নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ, গুম তদন্তেও প্রশ্ন

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০১:৪৩:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৪

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি

অংশীজনদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও সুপারিশ উপেক্ষা করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া অনুমোদন দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, প্রস্তাবিত দুই আইনের কিছু বিধান মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বুধবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি জানায়, দুই খসড়ায় কিছু ইতিবাচক বিষয় থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গায় অংশীজনদের আপত্তি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা, সদস্য নিয়োগ এবং গুমের অভিযোগ তদন্তের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যেসব ‘শৃঙ্খলাবাহিনী’র বিরুদ্ধে আসে, তাদের বিষয়ে কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্তের সুযোগ থাকা জরুরি। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে কিছু ক্ষেত্রে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরতার বিধান রাখা হয়েছে, যা কমিশনের কার্যকারিতা সীমিত করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আধিক্য রয়েছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। টিআইবির মতে, একটি স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়োগ কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যাতে কোনো পক্ষের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হয়।

কমিশনে নারী, সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও খসড়ায় যথেষ্ট স্পষ্টতা নেই বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। একই সঙ্গে কমিশন সরাসরি কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি বিভাগের অধীনে থাকবে কি না, সে বিষয়েও পরিষ্কার বিধান থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি।

টিআইবির অভিযোগ, কমিশনের সাংগঠনিক কাঠামো ও ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপনে সরকারের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এসব বিধান কার্যকর হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান না হয়ে সরকারি কাঠামোর অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ না করার একটি বিধান আগের খসড়ায় থাকলেও অনুমোদিত খসড়ায় সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে সামরিক আটককেন্দ্রকে কমিশনের নিয়মিত পরিদর্শনের আওতা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব পুরোপুরি পুলিশের হাতে রাখলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ অতীতে গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার নজির রয়েছে।

টিআইবি আরও বলেছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ধরনের বিধান বাস্তবে প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

গুমের সংজ্ঞায় জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায়ও উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। পাশাপাশি আটককেন্দ্র, কারাগার ও গোপন আটকস্থল পরিদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা খসড়া আইনে যথেষ্টভাবে রাখা হয়নি বলেও দাবি করেছে তারা।

সবশেষে টিআইবি বলেছে, মানবাধিকার রক্ষা ও গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধে আইন দুটি আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন কাঠামোর ভিত্তিতে তৈরি করা প্রয়োজন। সংসদে উত্থাপনের আগে ভুক্তভোগী, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে খসড়া দুটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

জনপ্রিয় সংবাদ

মানবাধিকার আইন নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ, গুম তদন্তেও প্রশ্ন

Update Time : ০১:৪৩:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

অংশীজনদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও সুপারিশ উপেক্ষা করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া অনুমোদন দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, প্রস্তাবিত দুই আইনের কিছু বিধান মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বুধবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি জানায়, দুই খসড়ায় কিছু ইতিবাচক বিষয় থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গায় অংশীজনদের আপত্তি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা, সদস্য নিয়োগ এবং গুমের অভিযোগ তদন্তের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যেসব ‘শৃঙ্খলাবাহিনী’র বিরুদ্ধে আসে, তাদের বিষয়ে কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্তের সুযোগ থাকা জরুরি। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে কিছু ক্ষেত্রে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরতার বিধান রাখা হয়েছে, যা কমিশনের কার্যকারিতা সীমিত করতে পারে।

আরও পড়ুন  কারফিউ নিয়ে আনিসুল-সালমানের ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে

তিনি আরও বলেন, কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আধিক্য রয়েছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। টিআইবির মতে, একটি স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়োগ কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যাতে কোনো পক্ষের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হয়।

কমিশনে নারী, সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও খসড়ায় যথেষ্ট স্পষ্টতা নেই বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। একই সঙ্গে কমিশন সরাসরি কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি বিভাগের অধীনে থাকবে কি না, সে বিষয়েও পরিষ্কার বিধান থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি।

টিআইবির অভিযোগ, কমিশনের সাংগঠনিক কাঠামো ও ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপনে সরকারের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এসব বিধান কার্যকর হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান না হয়ে সরকারি কাঠামোর অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন  ঐতিহাসিক কোটা সংস্কার রায়: হত্যাকাণ্ডেও থামেনি ছাত্র আন্দোলন

এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ না করার একটি বিধান আগের খসড়ায় থাকলেও অনুমোদিত খসড়ায় সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে সামরিক আটককেন্দ্রকে কমিশনের নিয়মিত পরিদর্শনের আওতা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব পুরোপুরি পুলিশের হাতে রাখলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ অতীতে গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার নজির রয়েছে।

আরও পড়ুন  স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যু: মেঘনায় গোসলে নেমে প্রাণ গেল ২ জনের

টিআইবি আরও বলেছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ধরনের বিধান বাস্তবে প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

গুমের সংজ্ঞায় জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায়ও উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। পাশাপাশি আটককেন্দ্র, কারাগার ও গোপন আটকস্থল পরিদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা খসড়া আইনে যথেষ্টভাবে রাখা হয়নি বলেও দাবি করেছে তারা।

সবশেষে টিআইবি বলেছে, মানবাধিকার রক্ষা ও গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধে আইন দুটি আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন কাঠামোর ভিত্তিতে তৈরি করা প্রয়োজন। সংসদে উত্থাপনের আগে ভুক্তভোগী, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে খসড়া দুটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।