মক্কা চুক্তি ঘিরে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কেউ দেখছেন প্রতীকী সহযোগিতা হিসেবে, আবার কেউ মনে করছেন এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে এই চুক্তি করা না হলেও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা—এই তিনের সমন্বয় ভারতের কৌশলগত হিসাবকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিন দেশের সামরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য বিস্তার। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। ১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সেনা ও বিমানবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সরঞ্জাম সহযোগিতা এবং যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
তবে মক্কা চুক্তিকে এখনই ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে দেখার বিষয়ে সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানির মতে, তিন দেশের কৌশলগত স্বার্থ এক নয়। ফলে এটি প্রচলিত অর্থে কোনো সামরিক জোটের চেয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে চুক্তির প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়। কারণ তিনটি দেশ তাদের আলাদা আলাদা শক্তিকে একটি যৌথ কাঠামোর মধ্যে আনছে।
এই সমীকরণে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থনীতি। বিপুল তেলসম্পদের কারণে দেশটি প্রতিরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে মিত্রদের আর্থিক সহযোগিতাও দিতে পারে। তুরস্কের শক্তি ভিন্ন জায়গায়—দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক প্রযুক্তি। ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। আর পাকিস্তান নিয়ে এসেছে বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। ফলে তিন দেশের শক্তির ধরন আলাদা হলেও পারস্পরিক পরিপূরক।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হতে পারে তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময় তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং পাকিস্তান তুরস্কের তৈরি ড্রোনও পেয়েছে। ভারতের সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত তুর্কি প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতায় আরও যুক্ত হলে তা ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির বিস্তার দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ সংঘাতের ধরনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ভারতের হিসাব অনেক বেশি জটিল। রিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও ভারতের সঙ্গেও সৌদি আরবের বড় অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। ভারতে সৌদি বিনিয়োগ, অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের বসবাস—দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি করেছে। ফলে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এই কারণেই মক্কা চুক্তি ভারতের জন্য সরাসরি সামরিক হুমকির চেয়ে একটি নতুন কূটনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
মক্কা চুক্তির পেছনে নির্দিষ্ট কোনো শত্রু আছে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। ভারতকে সরাসরি লক্ষ্য করে এই চুক্তি করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। ইরান বা হুতিদের বিরুদ্ধেও তিন দেশের অভিন্ন সামরিক অবস্থান রয়েছে, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা বিকল্প তৈরির প্রয়োজন থেকেই চুক্তিটি এসেছে—এমন ব্যাখ্যাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। মক্কা চুক্তির পাশাপাশি ভারতও পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। ভারত-গ্রিস ও ভারত-সাইপ্রাস সম্পর্কের উন্নতি, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ—সব মিলিয়ে একটি বিস্তৃত কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ফলে একদিকে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান সহযোগিতা, অন্যদিকে ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক অংশীদারত্ব—দুই প্রবণতাই একই সময়ে এগোচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মক্কা চুক্তি এখনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে পরিণত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যতে যৌথ মহড়া, অস্ত্র উৎপাদন, গোয়েন্দা সহযোগিতা কিংবা নতুন দেশকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়বে। বিশেষ করে মিসরের মতো কোনো দেশ এই কাঠামোয় যুক্ত হলে এর ভৌগোলিক ও সামরিক প্রভাব অনেক বিস্তৃত হতে পারে। তাই ভারতের জন্য চুক্তিটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি সরাসরি ভারতবিরোধী জোট হোক বা না হোক, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ বদলে দেওয়ার মতো সম্ভাবনা এতে রয়েছে।



























