ঢাকা ০৭:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

আল্লাহর ওপর ভরসার অনন্য দৃষ্টান্ত মুসা (আ.)-এর মা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৪:৪৪:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১২

বিপদের মুহূর্তেও আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেছিলেন নবী মুসা (আ.)-এর মা। | ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহর ওপর আস্থা মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও হৃদয়ে শক্তি জোগাতে পারে। নবী মুসা (আ.)-এর মায়ের ঘটনা এর এক অসাধারণ উদাহরণ। চারদিকে যখন ভয়, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর আশঙ্কা, তখন নিজের শিশুকে বাঁচানোর জন্য তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অকল্পনীয়। কিন্তু তাঁর ভরসার জায়গা ছিল একমাত্র আল্লাহ।

ফেরাউন বনি ইসরাইলের সন্তানদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাচ্ছিল। ভবিষ্যতে তাদের মধ্য থেকে এমন এক ছেলে জন্ম নেবে, যে তার রাজত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় নবজাতক ছেলেদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ঠিক সেই সময় জন্ম নেন মুসা (আ.)। তাঁর মায়ের জন্য সন্তানকে লুকিয়ে রাখা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তখন আল্লাহ তাঁকে বিশেষ নির্দেশ দেন।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, মুসা (আ.)-এর মাকে শিশুকে দুধ পান করাতে এবং ভয় দেখা দিলে তাকে সিন্দুকে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে আল্লাহ তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তিনি ভয় না পেতে এবং দুঃখ না করতে; কারণ তাঁর সন্তানকে আবার তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সুরা কাসাসের ৭ নম্বর আয়াতে এই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।

একজন মায়ের জন্য নিজের সদ্যোজাত সন্তানকে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তবু মুসা (আ.)-এর মা নিজের ভয়কে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কাছে সমর্পণ করেছিলেন। এখানেই রয়েছে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখার সবচেয়ে বড় শিক্ষা—সব পরিস্থিতির উত্তর মানুষের চোখে দৃশ্যমান না হলেও আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের সীমিত জ্ঞানের চেয়ে অসীমভাবে বিস্তৃত।

আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল আরও বিস্ময়কর। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া শিশুটিকে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হলো, যেখানে ফেরাউনের পরিবার তাকে খুঁজে পেল। অর্থাৎ যে শাসক মুসা (আ.)-এর মতো শিশুকে হত্যা করতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের প্রাসাদেই শিশুটির আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলো। ফেরাউনের স্ত্রী শিশুটিকে হত্যা না করে তাকে নিজেদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন। কোরআনে সুরা কাসাসের ৮-৯ নম্বর আয়াতে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

এরপর আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেন। মুসা (আ.) অন্য কোনো নারীর দুধ গ্রহণ করছিলেন না। ফলে তাঁর বোনের মাধ্যমে পরিবারের কাছে খবর পৌঁছায়। এভাবেই আল্লাহর পরিকল্পনায় শিশুমুসাকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে তাঁর মায়ের চোখ জুড়িয়ে দেওয়া এবং তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুরা কাসাসের ১৩ নম্বর আয়াতে এই শিক্ষা রয়েছে।

এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর ওপর আস্থা মানে বিপদে পড়ে কোনো চেষ্টা না করে বসে থাকা নয়। তাওয়াক্কুল হলো নিজের দায়িত্ব অনুযায়ী চেষ্টা করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এরপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। মুসা (আ.)-এর মা সন্তানকে রক্ষার জন্য নিজের সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব আল্লাহর হাতে সমর্পণ করেছিলেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসেও তাওয়াক্কুলের এই শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, মানুষ যদি যথাযথভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করত, তাহলে আল্লাহ তাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন পাখি সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)

তাই জীবনে যখন কোনো পরিস্থিতি অসম্ভব মনে হয়, তখন মুসা (আ.)-এর মায়ের ঘটনা মনে রাখা যেতে পারে। মানুষের চোখে যে পথ বন্ধ, আল্লাহর কাছে সেখানেই হয়তো নতুন পথের শুরু। প্রয়োজন হলো চেষ্টা, ধৈর্য, দোয়া এবং তাঁর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ কোরআনের এই ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তাঁর পরিকল্পনা সর্বোত্তম।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রিট একাডেমি সমাবর্তন ২০২৬: ১৬০+ গ্র্যাজুয়েটের আন্তর্জাতিক ডিগ্রি লাভ

আল্লাহর ওপর ভরসার অনন্য দৃষ্টান্ত মুসা (আ.)-এর মা

Update Time : ০৪:৪৪:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

আল্লাহর ওপর আস্থা মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও হৃদয়ে শক্তি জোগাতে পারে। নবী মুসা (আ.)-এর মায়ের ঘটনা এর এক অসাধারণ উদাহরণ। চারদিকে যখন ভয়, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর আশঙ্কা, তখন নিজের শিশুকে বাঁচানোর জন্য তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অকল্পনীয়। কিন্তু তাঁর ভরসার জায়গা ছিল একমাত্র আল্লাহ।

ফেরাউন বনি ইসরাইলের সন্তানদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাচ্ছিল। ভবিষ্যতে তাদের মধ্য থেকে এমন এক ছেলে জন্ম নেবে, যে তার রাজত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় নবজাতক ছেলেদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ঠিক সেই সময় জন্ম নেন মুসা (আ.)। তাঁর মায়ের জন্য সন্তানকে লুকিয়ে রাখা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তখন আল্লাহ তাঁকে বিশেষ নির্দেশ দেন।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, মুসা (আ.)-এর মাকে শিশুকে দুধ পান করাতে এবং ভয় দেখা দিলে তাকে সিন্দুকে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে আল্লাহ তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তিনি ভয় না পেতে এবং দুঃখ না করতে; কারণ তাঁর সন্তানকে আবার তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সুরা কাসাসের ৭ নম্বর আয়াতে এই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।

আরও পড়ুন  যে ৩ বৈশিষ্ট্যে মিলবে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ

একজন মায়ের জন্য নিজের সদ্যোজাত সন্তানকে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তবু মুসা (আ.)-এর মা নিজের ভয়কে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কাছে সমর্পণ করেছিলেন। এখানেই রয়েছে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখার সবচেয়ে বড় শিক্ষা—সব পরিস্থিতির উত্তর মানুষের চোখে দৃশ্যমান না হলেও আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের সীমিত জ্ঞানের চেয়ে অসীমভাবে বিস্তৃত।

আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল আরও বিস্ময়কর। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া শিশুটিকে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হলো, যেখানে ফেরাউনের পরিবার তাকে খুঁজে পেল। অর্থাৎ যে শাসক মুসা (আ.)-এর মতো শিশুকে হত্যা করতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের প্রাসাদেই শিশুটির আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলো। ফেরাউনের স্ত্রী শিশুটিকে হত্যা না করে তাকে নিজেদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন। কোরআনে সুরা কাসাসের ৮-৯ নম্বর আয়াতে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

আরও পড়ুন  হজ শেষে ফিরেছেন ৭৩০৭৬ বাংলাদেশি

এরপর আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেন। মুসা (আ.) অন্য কোনো নারীর দুধ গ্রহণ করছিলেন না। ফলে তাঁর বোনের মাধ্যমে পরিবারের কাছে খবর পৌঁছায়। এভাবেই আল্লাহর পরিকল্পনায় শিশুমুসাকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে তাঁর মায়ের চোখ জুড়িয়ে দেওয়া এবং তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুরা কাসাসের ১৩ নম্বর আয়াতে এই শিক্ষা রয়েছে।

এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর ওপর আস্থা মানে বিপদে পড়ে কোনো চেষ্টা না করে বসে থাকা নয়। তাওয়াক্কুল হলো নিজের দায়িত্ব অনুযায়ী চেষ্টা করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এরপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। মুসা (আ.)-এর মা সন্তানকে রক্ষার জন্য নিজের সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব আল্লাহর হাতে সমর্পণ করেছিলেন।

আরও পড়ুন  জুমার দিনে সুরা কাহাফ পাঠের ফজিলত ও গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসেও তাওয়াক্কুলের এই শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, মানুষ যদি যথাযথভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করত, তাহলে আল্লাহ তাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন পাখি সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)

তাই জীবনে যখন কোনো পরিস্থিতি অসম্ভব মনে হয়, তখন মুসা (আ.)-এর মায়ের ঘটনা মনে রাখা যেতে পারে। মানুষের চোখে যে পথ বন্ধ, আল্লাহর কাছে সেখানেই হয়তো নতুন পথের শুরু। প্রয়োজন হলো চেষ্টা, ধৈর্য, দোয়া এবং তাঁর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ কোরআনের এই ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তাঁর পরিকল্পনা সর্বোত্তম।