কলকাতায় হোটেলে আগুনের ঘটনায় বাবাকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে আট বছরের শিশু এলিনা হাসান রোজা। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ‘বাবা, বাবা’ বলে কাঁদছে সে। পরিবারের সদস্য ও বাবার বন্ধুরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাবাকে হারানোর কষ্ট যেন কিছুতেই সামলাতে পারছে না ছোট্ট রোজা। বুধবার বিকেলে সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ী এলাকায় আহম্মেদ বাবুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এমনই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের কান্না আর ছোট্ট শিশুটির বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
কলকাতায় হোটেলে আগুনে নিহত আহম্মেদ বাবুর বয়স হয়েছিল ৩৭ বছর। তিনি সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়নের বেগুনবাড়ী এলাকার প্রয়াত আদম আলীর ছেলে। স্থানীয় শাহীন সুপার মার্কেটে প্রসাধনসামগ্রীর দোকান চালাতেন তিনি। ব্যবসার প্রয়োজনে নিয়মিত ভারত যাতায়াত করতেন বাবু। নিজের দোকানের জন্য প্রসাধনসামগ্রী আনতে গত সোমবার রাতে তিনি কলকাতায় যান। কিন্তু পণ্য নিয়ে দেশে ফেরার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নেয় তাঁর জীবন। এ ঘটনায় বাবুসহ পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যুর পরিচয় নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ।
বাবুর পরিবারে স্ত্রী গুলশানারা বুবলি ছাড়াও রয়েছে দুই সন্তান। বড় মেয়ে রোজার বয়স আট বছর। ছোট ছেলে সোয়াতের বয়স পাঁচ। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে রোজা বুঝতে পারছে আপনজনকে হারানোর কষ্ট। কিন্তু ছোট সোয়াত এখনো পুরো বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেনি। বাবুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী গুলশানারা বুবলি কাজের জন্য বাড়ির বাইরে ছিলেন। স্বজনেরা তখনো তাঁকে সরাসরি মৃত্যুসংবাদ জানাননি। স্বামীর মৃত্যুর খবর তিনি কীভাবে সামলাবেন, সেই চিন্তায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দ্রুত বাড়িতে ফেরার জন্য ফোন করেন।
বাবুর সঙ্গে একই মার্কেটে দোকান চালান তাঁর বন্ধু মো. রায়হান। বাবুর মৃত্যুর খবর শুনে তিনি ছুটে যান তাঁর বাড়িতে। রায়হান জানান, কলকাতায় যাওয়ার আগে সোমবার বাবুর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। সব সময় হাসিমুখে থাকা বাবু সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। বয়সে সিনিয়র হলেও কখনো দূরত্ব তৈরি করতেন না। আরেক বন্ধু মো. ইমরান জানান, দোকানের মালামাল আনতে বাবু প্রায়ই ভারতে যেতেন। ভিসা বন্ধ থাকায় কিছুদিন যেতে পারেননি। ভিসা চালু হওয়ার পর আবার আবেদন করে ভিসা পান। গত মাসেও ভারত থেকে দোকানের পণ্য নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন তিনি।
কলকাতায় হোটেলে আগুন লাগার পর বাবুর সঙ্গে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল বলে জানান তাঁর বন্ধু ইমরান। এরপর আর তাঁর সঙ্গে কথা হয়নি। বুধবার দুপুরে বাবুর এক বন্ধুর ফোনে কলকাতার বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে যোগাযোগ করা হয়। ‘বাবু খান’ নামে কাউকে চেনেন কি না, জানতে চাওয়া হয়। পরে একটি ছবি পাঠানো হলে সেটি দেখে বন্ধুরা নিশ্চিত হন, নিহত ব্যক্তি তাঁদের পরিচিত আহম্মেদ বাবু। বন্ধুদের ধারণা, আগুনের সময় তৈরি হওয়া ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। বাবুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর সহকর্মী ও বন্ধুরা আমিনবাজারের বাড়িতে ছুটে যান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি হয়েছে। খবর পাওয়ার পর কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে হতাহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া আহত ছয় বাংলাদেশিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সাভারের আমিনবাজারে এখন এসব হিসাবের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি পরিবারের শোক। বাবাকে হারিয়ে ছোট্ট রোজার মুখে শুধু একটাই ডাক—‘বাবা, বাবা’।




























