গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। নতুন এলএনজি কার্গো না আসায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বুধবার বেলা তিনটার দিকে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের জোগান আরও কমে যায়। ফলে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংকট কাটার বদলে পরিস্থিতি আবারও কঠিন হয়ে উঠেছে। গতকাল এলএনজি থেকে যেখানে ৬৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল, আজ তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৫ কোটি ঘনফুটে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। গত শনিবার সামিটের টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হওয়ার পাশাপাশি এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকেও সীমিত আকারে সরবরাহ শুরু হয়েছিল। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। তবে এক্সিলারেটের টার্মিনালে নতুন এলএনজি না থাকায় কয়েক দিন ধরে সরবরাহ ধীরে ধীরে কমছিল। শেষ পর্যন্ত বুধবার বিকেলে সেটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টার্মিনালে পর্যাপ্ত এলএনজি মজুত না থাকায় সরবরাহ বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
দেশে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের বিষয়টি তদারক করে পেট্রোবাংলা। আর আমদানির দায়িত্বে রয়েছে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড বা আরপিজিসিএল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এলএনজি কেনার জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতেও কয়েকটি কার্গোর ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। কম দামে দ্রুত এলএনজি সংগ্রহের লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু চলতি মাসে আসার কথা থাকা চারটি কার্গোর কোনোটিই সময়মতো আসেনি। ফলে টার্মিনাল প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি দেশীয় কোম্পানি সামিট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। পরে গত শনিবার সেটি আবার এলএনজি সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু নতুন কার্গো না থাকায় পুরোনো মজুত থেকে সীমিত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। সোমবার থেকে সেই সরবরাহও কমতে থাকে। বুধবার এসে তা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহেও বড় প্রভাব পড়েছে। দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে বর্তমানে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসে বড় একটি অংশ। এক্সিলারেট টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট। আর সামিট টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। দুই টার্মিনাল স্বাভাবিকভাবে চললে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়।
সাম্প্রতিক হিসাবেও পরিস্থিতির অবনতির চিত্র স্পষ্ট। গত শুক্রবার দুটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে গিয়েছিল দৈনিক ১৬৪ কোটি ঘনফুটে। পরে সামিট থেকে সরবরাহ শুরু হলে শনিবার তা বেড়ে ২৪২ কোটি ঘনফুটে ওঠে। রোববার সরবরাহ ছিল ২৪০ কোটি ঘনফুট এবং সোমবার কমে ২২৮ কোটি ঘনফুটে নামে। বুধবার এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর মোট গ্যাস সরবরাহ আরও কমে ২১৮ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার একটি এলএনজি কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। সেটি সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে এক্সিলারেটের জন্য নতুন কার্গো ২৩ বা ২৪ আগস্ট আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক দিন ওই টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। নতুন কার্গো সময়মতো না এলে গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘ হতে পারে। এতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাসাবাড়ির গ্যাস সরবরাহেও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে গতকাল এলএনজি থেকে ৬৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হলেও এক্সিলারেট টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর আজ সেই পরিমাণ কমে ৫৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানেই এলএনজি সরবরাহে ১১ কোটি ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এখন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে দ্রুত নতুন এলএনজি কার্গো দেশে আনার দিকেই তাকিয়ে সংশ্লিষ্টরা।




























