দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে শত শত শিল্প-কারখানা। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির পর এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্যাসনির্ভর শিল্প খাত। উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে রফতানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম যোগ হচ্ছে।
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৫০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে, আবার কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, কাগজ ও স্পিনিং শিল্পের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে রফতানি আদেশ বাতিল, জরিমানা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাস সংকটের পাশাপাশি অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটও শিল্প খাতকে চাপে ফেলেছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চললে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, এটি শুধু সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। তার মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমস্যা কেবল একটি এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি নয়। গত কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। ফলে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যেকোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বিদেশি প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতের কাজ করছেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন, মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং অতিরিক্ত এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প খাত দীর্ঘ সময় জ্বালানি সংকটে থাকলে এর প্রভাব শুধু উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রফতানি আয়, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আদায় এবং নতুন বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




























