দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে মস্তিষ্কে টিউমার হয়-এমন ধারণা নিয়ে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ রয়েছে।বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ফোন কানে ধরে কথা বলা বা ঘুমানোর সময় ফোন পাশে রাখার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।তবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে মস্তিষ্কের টিউমারের নিশ্চিত কারণগত সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।২০২৪ সালের বড় আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও বেশি সময় ফোনে কথা বলা ব্যক্তিদের মধ্যে মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্মার্টফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নানা কাজে মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন।কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, ভিডিও দেখা, অনলাইন কেনাকাটা ও কাজের প্রয়োজনে ফোনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।ফলে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
মোবাইল ফোন থেকে যে বেতার তরঙ্গ বা রেডিওফ্রিকোয়েন্সি নির্গত হয়, তা অ-আয়নীকরণ বিকিরণের অন্তর্ভুক্ত।এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো আয়নায়ন বিকিরণের তুলনায় এই তরঙ্গের শক্তি অনেক কম।আয়নীকরণ রশ্মি কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে মোবাইল ফোনের রেডিও তরঙ্গ বিকিরণের প্রধান স্বীকৃত প্রভাব হলো খুব বেশি মাত্রায় টিস্যুতে উত্তাপ সৃষ্টি করা।
তবে মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা বা আইএআরসি রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে ‘সম্ভাব্যভাবে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে’ এমন শ্রেণিতে রেখেছে।এই শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ মোবাইল ফোন ক্যানসার সৃষ্টি করে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা নয়।
বরং সীমিত ও অনিশ্চিত মানব-গবেষণার তথ্যের কারণে সম্ভাবনাটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায়নি এবং আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও মস্তিষ্কের টিউমারের সম্পর্ক জানতে বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের গবেষণা করা হয়েছে।এসব গবেষণায় মূলত ফোন ব্যবহারের সময়, কলের পরিমাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের সঙ্গে টিউমারের ঝুঁকির সম্পর্ক খোঁজা হয়েছে।কিছু পুরোনো গবেষণায় সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ফলাফল সব ক্ষেত্রে একই ছিল না।
গবেষণার পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারকারীদের ফোন ব্যবহারের হিসাবের পার্থক্যও ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।২০২৪ সালে প্রকাশিত COSMOS গবেষণাটি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।গবেষণাটিতে আড়াই লাখের বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।অংশগ্রহণকারীদের অনেকেরই গবেষণায় যুক্ত হওয়ার আগে ১৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ইতিহাস ছিল।
গবেষকদের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি মোট সময় ফোনে কথা বলা ব্যক্তিদের মধ্যে কম ব্যবহারকারীদের তুলনায় মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি বেশি পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় গ্লিওমা, মেনিনজিওমা ও অ্যাকোস্টিক নিউরোমার মতো কয়েক ধরনের মস্তিষ্কের টিউমারের বিষয়ও দেখা হয়েছে।অংশগ্রহণকারীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহের পর তাদের স্বাস্থ্যগত তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়।গবেষণাটির ফলাফল অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মোট কল-সময় থাকা ১০ শতাংশ ব্যবহারকারীর মধ্যে টিউমারের ঘটনা কম ব্যবহারকারীদের তুলনায় বেশি ছিল না।এ কারণে গবেষকরা মোবাইল ফোন ব্যবহার ও এসব মস্তিষ্কের টিউমারের মধ্যে বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্কের প্রমাণ পাননি।
তবে একটি গবেষণার ফলাফল দিয়ে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল একসঙ্গে মূল্যায়ন করে বিজ্ঞানীরা কোনো বিষয়ে শক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।মোবাইল ফোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং প্রযুক্তিও নিয়মিত পরিবর্তিত হচ্ছে।তাই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে আরও গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো ফোনটি শরীরের কতটা কাছে থাকে।ফোন কানে ধরে কথা বলার সময় মাথা ফোনের খুব কাছাকাছি থাকে এবং শরীরের তুলনায় মাথায় রেডিওফ্রিকোয়েন্সি শক্তির শোষণ বেশি হতে পারে।তবে ফোনের নকশা, অ্যান্টেনার অবস্থান, ফোন ও বেস স্টেশনের দূরত্ব এবং সংযোগের মানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শোষিত শক্তির মাত্রা নির্ভর করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যবহারে ফোন থেকে মাথায় শোষিত শক্তি নির্ধারিত নিরাপত্তা নির্দেশিকার মধ্যে থাকে।
ফোনের সিগন্যাল দুর্বল হলে মোবাইল ফোনের ট্রান্সমিশন পাওয়ার বাড়তে পারে।অন্যদিকে ভালো নেটওয়ার্ক সংযোগ থাকলে ফোন তুলনামূলক কম শক্তিতে যোগাযোগ করতে পারে।এ কারণে একই ফোন ব্যবহার করলেও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রেডিও তরঙ্গ সংস্পর্শ মাত্রা একরকম নাও হতে পারে।
তবে এসব বিষয়কে সরাসরি মস্তিষ্কের টিউমার হওয়ার কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।
মোবাইল টাওয়ার নিয়েও অনেক মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তা রয়েছে।বাড়ির কাছাকাছি মোবাইল টাওয়ার থাকলে মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি বাড়ে—এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বর্তমানে নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের এলাকায় মোবাইল টাওয়ারের কারণে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি এক্সপোজার সাধারণত তুলনামূলক কম থাকে।
টাওয়ারের অ্যান্টেনার অবস্থান, দিক, দূরত্ব ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় অনুযায়ী এক্সপোজারের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।
মোবাইল ফোনের তুলনায় দূরের টাওয়ার থেকে মানুষের শরীরে পৌঁছানো রেডিও তরঙ্গ সাধারণত অনেক কম হতে পারে।কারণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় ফোনটি শরীরের খুব কাছাকাছি থাকে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত এলাকায় মোবাইল টাওয়ারের সংকেতের মাত্রা সাধারণত নিরাপত্তা নির্দেশিকার নিচে থাকে।
তাই শুধু বাড়ির কাছে মোবাইল টাওয়ার রয়েছে বলেই মস্তিষ্কের টিউমারের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
এখানে ‘সম্ভাব্যভাবে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে’ শ্রেণিবিন্যাসটি বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ।আইএআরসির Group 2B শ্রেণি কোনো নির্দিষ্ট পদার্থ বা প্রযুক্তি যে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার সৃষ্টি করে, তা বোঝায় না।এই শ্রেণিতে এমন বিষয় রাখা হয়, যেখানে মানুষের ওপর সীমিত প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু ফলাফল থেকে নিশ্চিত কারণগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তাই এই শ্রেণিবিন্যাসকে ‘মোবাইল ফোনে ক্যানসার হয়’—এমন সরাসরি বক্তব্য হিসেবে ব্যবহার করা সঠিক নয়।দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে শুধু টিউমারের বিষয়েই আলোচনা করা উচিত নয়।অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে চাপ, ঘাড় ও কাঁধে অস্বস্তি এবং ঘুমের সময়সূচিতে সমস্যা হতে পারে।বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করলে ঘুমের অভ্যাস ব্যাহত হতে পারে।তাই ফোন ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য উপকারী হতে পারে।
ফোন ব্যবহারের সময় একটানা দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে না থাকাও ভালো অভ্যাস।দীর্ঘ সময় ফোন কানে ধরে কথা বলার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিকার বা হ্যান্ডস-ফ্রি সুবিধা ব্যবহার করা যেতে পারে।ফোন ব্যবহারের মাঝে বিরতি নেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ কল কমানোও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
এসব অভ্যাসকে মস্তিষ্কের টিউমার প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় হিসেবে নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় এক্সপোজার কমানোর সাধারণ সতর্কতা হিসেবে দেখা উচিত।
মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশু ও কিশোরদের নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে।তাদের মাথার গঠন ও শরীরের বৈশিষ্ট্য বড়দের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় রেডিওফ্রিকোয়েন্সি এক্সপোজার নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।আইএআরসি জানিয়েছে, শিশু-কিশোরদের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য রেডিওফ্রিকোয়েন্সি উৎসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।তবে শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহার মস্তিষ্কের টিউমার সৃষ্টি করে—এমন নিশ্চিত প্রমাণও বর্তমানে নেই।
মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে ব্যবহার কমানোর কিছু সহজ উপায় অনুসরণ করা যেতে পারে।দীর্ঘ ফোনালাপের সময় স্পিকার বা হ্যান্ডস-ফ্রি ডিভাইস ব্যবহার করলে ফোনটি মাথা থেকে দূরে রাখা যায়।ভালো নেটওয়ার্ক থাকা অবস্থায় ফোন ব্যবহার করাও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি ট্রান্সমিশন পাওয়ার এড়াতে সহায়ক হতে পারে।তবে এসব পদক্ষেপকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ব্রেইন টিউমার প্রতিরোধের প্রমাণিত পদ্ধতি বলা যাবে না।
স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে শুধু মোবাইল ফোনের বিকিরণকে দায়ী করা উচিত নয়।মাথাব্যথা, দৃষ্টির সমস্যা, খিঁচুনি, দুর্বলতা বা অন্য কোনো নতুন ও গুরুতর উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।কারণ এসব উপসর্গের পেছনে বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকতে পারে।
সঠিক কারণ জানতে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।
বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার করলেই মস্তিষ্কে টিউমার হয়—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।বিশেষ করে ২০২৪ সালের COSMOS গবেষণায় বেশি মোট কল-সময় থাকা ব্যবহারকারীদের মধ্যে মস্তিষ্কের টিউমারের বাড়তি ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।তবে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলমান থাকায় বিষয়টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।বিজ্ঞানভিত্তিক নতুন তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে এই বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা তৈরি হতে পারে।
সুতরাং মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার অতিরিক্ত ব্যবহারকেও স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
ফোন ব্যবহারে প্রয়োজনীয় বিরতি নেওয়া, রাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো এবং দীর্ঘ কলের ক্ষেত্রে হ্যান্ডস-ফ্রি সুবিধা ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাড়ির কাছে মোবাইল টাওয়ার থাকলেই মস্তিষ্কে টিউমার হবে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণও বর্তমানে নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবের বদলে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসকের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া।




























