রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। মিয়ানমার বাংলাদেশে থাকা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার কথা বললেও প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের পুরোনো ‘বাঙালি’ অবস্থানও আবার সামনে এসেছে।
মিয়ানমারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে, তার মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না বলে জানিয়েছে নেপিদো।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। কাউকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা আর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া এক বিষয় নয়। অতীতেও রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাই ও প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে নিশ্চয়তা না থাকায় বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরানো সম্ভব হয়নি।
এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে রাখাইনের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ায়। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাখাইনে আরাকান আর্মি শক্তিশালী হয়ে রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে যেসব এলাকায় রোহিঙ্গাদের ফেরার কথা বলা হচ্ছে, সেসব অঞ্চলের বড় অংশে মিয়ানমার সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
এই পরিবর্তনের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পুরোনো কাঠামোও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আগে ধারণা ছিল, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করা সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো—ফেরার পর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে, স্থানীয় প্রশাসন কে পরিচালনা করবে এবং নাগরিকত্ব ও চলাচলের অধিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কে?
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করার পুরোনো অবস্থানও সংকটকে আরও জটিল করছে। একদিকে মিয়ানমার কিছু মানুষকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, অন্যদিকে তাদের রোহিঙ্গা পরিচয় অস্বীকার করছে। ফলে প্রত্যাবাসনের আগে শুধু সংখ্যা যাচাই নয়, পরিচয়, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, নয় বছর আগের তুলনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা এখন অনেক বেশি জটিল। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসইভাবে ফেরাতে হলে শুধু তালিকা যাচাই বা প্রত্যাবাসনের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। রাখাইনের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।




























