মেসির অবসর ঘোষণায় বিশ্ব ফুটবলে নেমে এসেছে আবেগঘন এক মুহূর্ত। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে দুই দশকের বেশি সময়ের বর্ণিল পথচলার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন কিংবদন্তি অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা নিজের সিদ্ধান্তের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের পর দীর্ঘ সময় ভেবে তিনি জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
মেসির অবসর অবশ্য হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি বিদায়ী বার্তাটি লিখেছিলেন বলে জানিয়েছেন। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। এরপর ব্যক্তিগত কিছু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আরও দৃঢ় হন মেসি। তার বিদায়ী বার্তায় জাতীয় দলের জার্সির প্রতি দীর্ঘদিনের ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের কথাও উঠে এসেছে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা ছিল উত্থান-পতনে ভরা। শুরুর দিকে একাধিক হতাশা ও বড় ম্যাচের পরাজয় তাকে কঠিন সমালোচনার মুখে ফেলেছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্যর্থতা—সবকিছু মিলিয়ে তার আন্তর্জাতিক অধ্যায় একসময় অপূর্ণই মনে হচ্ছিল। এমনকি ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে বদলে দেন পুরো গল্প। সেই প্রত্যাবর্তনের পরই শুরু হয় আর্জেন্টিনার সোনালি সময়।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আসে বড় বাঁক। এরপর ২০২২ সালের ফাইনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ জয় তার ক্যারিয়ারকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনা। ২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসির নেতৃত্বে দল ফাইনালে ওঠে এবং টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার বিরল কীর্তি গড়ে। শেষ পর্যন্ত শিরোপা না পেলেও আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির নেতৃত্বের অধ্যায় ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
মেসির অবসরের সঙ্গে শেষ হলো আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের একটি অসাধারণ যুগ। তার বিদায়ী বার্তায় তিনি জানান, জাতীয় দলের হয়ে সবসময় নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সমর্থকদের আনন্দ দিতে এবং আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত করার জন্য জার্সিটির জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে দলে উঠে আসা তরুণ খেলোয়াড়দের জায়গা করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যতে গ্যালারিতে বসে দলের একজন সমর্থক হিসেবেই আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছেন এই মহাতারকা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার শুধু ট্রফি কিংবা রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ২০০-এর বেশি ম্যাচ খেলেছেন এবং দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও তার ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ পূর্ণ করার কীর্তিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছিল। বিশ্বকাপ, দুই কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমা জয়—সব মিলিয়ে মেসির জাতীয় দল অধ্যায় হয়ে উঠেছে এক প্রজন্মের ফুটবল স্মৃতি।
মেসির অবসরের খবর তাই শুধু একটি ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি একটি যুগের সমাপ্তির প্রতীক। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার বাঁ পায়ের জাদু, নিখুঁত পাস, অসংখ্য গোল এবং অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও ক্লাব ফুটবলে তার পথচলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে ভক্তদের কাছে এখন একটাই আশা—আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ হলেও ফুটবলের মাঠে মেসির জাদু যেন আরও কিছুদিন দেখা যায়।





























