বিদেশে বসেই এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ নির্বিঘ্নে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীরব ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন আদালত।
পাশাপাশি এস আলমের ভাই মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হাসানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত-১-এর জারি করা আটকাদেশের পরোয়ানাও স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। গত রোববার বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মো. লুৎফর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন।
একই সঙ্গে আবদুল্লাহ হাসানের বিরুদ্ধে জারি করা ওই আটকাদেশের পরোয়ানা কেন সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারের প্রতি চার সপ্তাহের একটি রুলও জারি করা হয়েছে। আদালত তাঁদের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সাইফুল আলম মাসুদ বিদেশে অবস্থান করেও তাঁর হয়ে কাজ করা একটি বিশাল নেটওয়ার্কের সহায়তায় এসব ব্যবসায়িক কার্যক্রম অনায়াসেই চালিয়ে যাচ্ছেন।
শুনানি চলাকালে আদালত আরও বলেন যে, অতীতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি সহায়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেই রাতারাতি ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ।
তখন তাঁর পরিবারের সদস্যদের জোরপূর্বক কোম্পানির পরিচালক করা হয়েছিল, যার ফলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতাই ছিল না বললেই চলে।
আদালত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, বিগত সংসদ এমনভাবে আইন প্রণয়ন করেছিল, যাতে সাইফুল আলম মাসুদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একচেটিয়া সুবিধা পান। আদালতের ভাষায়, সেই সময় মূলত ধনীদের রক্ষা করার এবং গরিবদের নিপীড়ন করার উদ্দেশ্যেই দেশের আইনগুলো করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, এস আলম গ্রুপের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের পরিচালক পদে রয়েছেন আবদুল্লাহ হাসান। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বিশাল ঋণ খেলাপির এক ঘটনায় চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১ তাঁর বিরুদ্ধে এই আটকাদেশের পরোয়ানা জারি করেছিলেন। পরে এটি বাতিল চেয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন এবং শুনানির পর আদালত তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানাটি স্থগিত করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ১৩৪টি বাস কেনার নাম করে ওজি ট্রাভেলসকে ৮০ কোটি টাকার বেশি ঋণ অনুমোদন করেছিল ইসলামী ব্যাংক। এরপর ২০২৪ সালের ১০ মার্চ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত মোট আটটি ধাপে ওই ঋণের অর্থ ছাড় করা হলেও চুক্তি অনুযায়ী কোনো বাস সরবরাহ করা হয়নি বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ঋণের অর্থও আর পরিশোধ করা হয়নি।
ফলে ঋণের টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার কর্মকর্তা মো. এরশাদের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১-এ মামলাটি দায়ের করা হয়। সেই মামলায় গত ২১ মে অর্থঋণ আদালতের বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর ভাই আবদুল্লাহ হাসানসহ ১১ জনকে পাঁচ মাসের দেওয়ানি আটকাদেশ দেন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
হাইকোর্টে আবদুল্লাহ হাসানের পক্ষে শুনানিতে আইনজীবী মো. রুহুল আমিন ভূঁইয়া প্রশ্ন তোলেন, আবদুল্লাহ হাসান কেন ওই ঋণ পরিশোধ করবেন, কারণ তিনি ওই ঋণের প্রকৃত ঋণগ্রহীতা, বন্ধকদাতা বা জামিনদার ছিলেন কি না, সেই প্রমাণ ব্যাংককে উপস্থাপন করতে হবে। যদিও মামলায় তাঁকে ‘মৌখিক জামিনদার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে রোববারের শুনানিতে রিটের তীব্র বিরোধিতা করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী বলেন, আবদুল্লাহ হাসান যেহেতু পলাতক, তাই হাইকোর্টে প্রতিকার চাওয়ার আগে তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে ওই আদালতের আদেশ মেনে চলতে হবে এবং সরকার হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবে।



























