জনসন চার্লস আউট হয়ে মাঠ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কয়েক মুহূর্ত পরই বদলে গেল পুরো দৃশ্যপট। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পর জানা গেল, যে বলটিতে তিনি আউট হয়েছেন সেটি আসলে নো বল। কিন্তু ততক্ষণে চার্লস ড্রেসিংরুমের পথে। ক্রিকেটের নিয়মে তাঁকে আর মাঠে ফিরিয়ে আনার সুযোগও ছিল না। শেষ পর্যন্ত সেই চার্লসই ফিরে এসে খেললেন ম্যাচজয়ী ইনিংস। ৪৫ বলে ৭৮ রান করে শুধু নিজের দলকে জেতাননি, ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্রও হয়ে উঠেছেন তিনি। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস প্যাট্রিয়টস ও বার্বাডোজ ট্রাইডেন্টসের ম্যাচে ঘটেছে এই নাটকীয় ঘটনা।
ম্যাচের চতুর্থ ওভারে র্যামন সিমন্সের করা একটি হাই ফুল টসে ক্যাচ তুলে দেন চার্লস। মাঠের আম্পায়ার ক্রিস রাইট ও জাহিদ বাসারাথ বলটিকে নো বল ঘোষণা করেননি। ফলে ক্যাচটি বৈধ হওয়ায় আউট হন চার্লস। তখন তাঁর স্কোর ১৫ বলে ২৬ রান। সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েই মাঠ ছাড়েন তিনি। কিন্তু চার্লসের মাঠ ছাড়ার পরই শুরু হয় আলোচনা। গ্যালারির দর্শক থেকে শুরু করে প্যাট্রিয়টসের ডাগআউট—অনেকেই মনে করছিলেন, বলটি ব্যাটারের কোমরের উচ্চতার ওপরে ছিল। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি চলে যায় টিভি আম্পায়ারের পর্যালোচনায়।
রিপ্লে দেখে টিভি আম্পায়ার কার্ল টাকেটের মনে হয়, সিমন্সের ডেলিভারিটি নো বল ছিল। অর্থাৎ চার্লসকে যে বলে আউট দেওয়া হয়েছিল, সেটি বৈধ ডেলিভারি ছিল না। ফলে মাঠের আম্পায়ারদের দেওয়া আউটের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। এখানেই তৈরি হয় নতুন জটিলতা। কারণ চার্লস ততক্ষণে মাঠ ছেড়ে চলে গেছেন। ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাটসম্যান ভুলভাবে আউট হলেও তিনি মাঠ ছাড়ার পর আম্পায়ার তাঁকে এভাবে ফিরিয়ে আনতে পারেন না। সিদ্ধান্তটি মাঠ ছাড়ার আগেই সংশোধন করতে হয়। তাই চার্লসকে ডেকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ ছিল না, যদিও তাঁর আউটটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গিয়েছিল।
এই ঘটনায় ট্রাইডেন্টস অধিনায়ক ক্রিস গ্রিন বেশ অসন্তুষ্ট হন। ক্যাচ নেওয়া শেরফানে রাদারফোর্ডও আম্পায়ারদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তবে সিদ্ধান্ত একবার বদলে যাওয়ার পর সেটি আর আগের অবস্থায় ফেরানো হয়নি। ফলে চার্লস আবার ব্যাটিংয়ে নামার সুযোগ পান এবং পাওয়া নো বলের কারণে আসে ফ্রি-হিট। মজার ব্যাপার হলো, সেই ফ্রি-হিটেই ছক্কা মেরে নিজের প্রত্যাবর্তনকে আরও স্মরণীয় করে তোলেন তিনি। যে মুহূর্তে মনে হয়েছিল তাঁর ইনিংস শেষ, সেখান থেকেই যেন নতুন করে ম্যাচ শুরু করেন চার্লস।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। শুরুতে ১৫ বলে ২৬ রান করে মাঠ ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৪৫ বলে ৭৮ রান। ইনিংসটিতে ছিল আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ছাপ, আর সবচেয়ে বড় বিষয়—চাপের মুহূর্তে তিনি নিজের সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। চার্লসের এই ইনিংসের ওপর ভর করেই সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস প্যাট্রিয়টস ২১৭ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করে ফেলে। ম্যাচ শেষ হওয়ার সময় হাতে ছিল আরও পাঁচ বল। অর্থাৎ যে ব্যাটসম্যানকে কিছুক্ষণ আগেই আউট হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে গেলেন ম্যাচের নায়ক। স্বাভাবিকভাবেই ৭৮ রানের ইনিংসের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে।
ক্রিকেটে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে জনসন চার্লসের এই ঘটনা আলাদা করে আলোচনায় এসেছে, কারণ এখানে একটি সিদ্ধান্ত শুধু বদলেই যায়নি, তার প্রভাব পড়েছে ম্যাচের ফলেও। মাঠের সিদ্ধান্তে চার্লসকে আউট মনে হলেও পরে প্রযুক্তির সাহায্যে সেটি ভুল প্রমাণিত হয়। নিয়মের কারণে তাঁকে সরাসরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও নো বলের সুবিধা থেকে পাওয়া সুযোগ তিনি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। আউট হয়ে মাঠ ছাড়ার পর ফিরে এসে ৭৮ রান করে দলকে জেতানো—টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের নাটকীয়তার সঙ্গে এমন গল্পই যেন সবচেয়ে বেশি মানিয়ে যায়। চার্লসের এই ইনিংস তাই শুধু একটি ম্যাচজয়ী ব্যাটিং নয়, আম্পায়ারিং, প্রযুক্তি, ক্রিকেটের আইন এবং ভাগ্যের এক অদ্ভুত সমন্বয়ের গল্পও হয়ে থাকল।



























