মেসি যুক্তরাষ্ট্রে থাকুন—এটাই এখন চান আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা হুয়ান রোমান রিকেলমে। তাঁর মতে, লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার ফুটবলকে যা দেওয়ার, তার সবই দিয়ে ফেলেছেন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা থেকে শুরু করে জাতীয় দলের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান—সব স্বপ্নই পূরণ হয়েছে মেসির হাত ধরে। তাই ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে তাঁকে আর কোনো চাপের মধ্যে দেখতে চান না রিকেলমে। বরং নিজের মতো করে ফুটবল উপভোগ করার সুযোগ মেসির প্রাপ্য বলে মনে করেন তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সি থেকে বিদায়ের পর মেসির সামনে এখন ক্লাব ফুটবলই বড় অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়টি যুক্তরাষ্ট্রেই চালিয়ে যাওয়াকে সবচেয়ে ভালো মনে করছেন রিকেলমে।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম TyC Sports-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিকেলমে মেসির প্রতি কৃতজ্ঞতার কথাই বেশি বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর—আর্জেন্টিনার মানুষের এখন মেসির কাছে আর কিছু চাওয়ার নেই। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার ব্যর্থতার মুখে পড়েও মেসি জাতীয় দলের হয়ে লড়াই থামাননি। শুরুর দিকে ট্রফি না পাওয়ার হতাশা তাঁকে ঘিরে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই মেসিই আর্জেন্টিনাকে বড় শিরোপা এনে দিয়েছেন। রিকেলমের চোখে এটাই মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি মনে করেন, বছরের পর বছর বিশ্বসেরা পর্যায়ে টিকে থাকা নিজেই অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তাই এখন সমালোচনা নয়, মেসিকে ভালোবাসা ও ধন্যবাদ জানানোর সময়।
মেসির সঙ্গে রিকেলমের সম্পর্কও কেবল সতীর্থের নয়, তার চেয়েও গভীর। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে দুজন একসঙ্গে খেলেছেন এবং ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে সোনার পদক জয়ের দলেও ছিলেন। সেই সময়ের স্মৃতি এখনো রিকেলমের কাছে বিশেষ। মেসির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। দুজনের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্মান এখনো অটুট। ২০২৩ সালে রিকেলমের বিদায়ী ম্যাচেও মেসির উপস্থিতি ছিল সেই সম্পর্কেরই আরেকটি উদাহরণ। মেসির আগে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি পরা রিকেলমে তাই মেসির পথচলা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মনে করেন, মেসিকে এখন নিজের সিদ্ধান্ত ও নিজের আনন্দ অনুযায়ী ক্যারিয়ারের শেষটা কাটাতে দেওয়া উচিত।
মেসি যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে তাঁর ওপর চাপ কম থাকবে—রিকেলমের কথার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এটিই। আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলে মেসি ফিরলে তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা যে আকাশচুম্বী হবে, সেটি সহজেই অনুমেয়। প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি অনুশীলন কিংবা ছোট কোনো পারফরম্যান্সও তখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে মেসি নিজের ছন্দে খেলতে পারছেন এবং Inter Miami CF-এর অফিসিয়াল প্রোফাইল অনুযায়ী তিনি এখনো ক্লাবটির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ২০২৫ সালে ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর চুক্তিও ২০২৮ MLS মৌসুম পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অবস্থান শুধু আবেগের বিষয় নয়, বাস্তব ফুটবল ক্যারিয়ার হিসেবেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্য মেসির আর্জেন্টিনায় ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। নিজের শৈশবের ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে ফিরে ক্যারিয়ারের শেষ সময় কাটানোর ইচ্ছার কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। সেই সম্ভাবনাই এবার রিকেলমের মন্তব্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তবে রিকেলমে মেসিকে আর্জেন্টিনার ফুটবল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চান—বিষয়টি এমন নয়। বরং তাঁর বক্তব্যে রয়েছে এক ধরনের ভালোবাসা ও সুরক্ষার ভাবনা। মেসি যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যত দিন খেলতে চান, তত দিন তাঁকে খেলতে দেওয়াই উচিত বলে মনে করেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে যে অধ্যায় শেষ হয়েছে, সেটিকে সম্মানের সঙ্গে মেনে নিয়ে এখন মেসির ব্যক্তিগত আনন্দকেই গুরুত্ব দিতে বলছেন এই সাবেক তারকা।
মেসিকে নিয়ে রিকেলমের আরেকটি মন্তব্যও আর্জেন্টাইন ফুটবলে নতুন করে আবেগ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে মেসির মতো আরেকজন ফুটবলার পাওয়া যাবে কি না, সেটি বলা কঠিন। দিয়েগো ম্যারাডোনার পর যেমন সবাই ভেবেছিল এমন প্রতিভা আর আসবে না, তেমনই মেসির পরও হয়তো একই প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু আর্জেন্টিনা একই প্রজন্মে ম্যারাডোনা ও মেসির মতো দুই কিংবদন্তিকে পেয়েছে—এটাই তাদের বিরাট সৌভাগ্য। তাই এখন মেসিকে নিয়ে ভবিষ্যতের হিসাব না করে তাঁর বর্তমানটা উপভোগ করতে দেওয়াই উচিত। মেসি যুক্তরাষ্ট্রে থাকুন, নিজের মতো খেলুন, নিজের মতো জীবন কাটান—রিকেলমের বার্তাটি মূলত এমনই। আর আর্জেন্টাইনরা দূর থেকেই তাঁদের প্রিয় তারকাকে ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়ে যাবে।























