ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে জোড়া গোল করে নায়ক বনে যান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। আরেকটি গোল করেন মাতেউস কুনিয়া। দুর্দান্ত এই জয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা নকআউট পর্বে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ব্রাজিল। কোচ কার্লো আনচেলত্তির দল বলের দখল ধরে রেখে স্কটল্যান্ডের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। সেই চাপের ফলও আসে দ্রুত। ম্যাচের সপ্তম মিনিটে স্কটিশ ডিফেন্ডার স্কট ম্যাকেনার ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
গোলের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ব্রাজিল। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারায়েস, কাসেমিরো ও রায়ানদের দারুণ সমন্বয়ে একের পর এক আক্রমণ তৈরি হতে থাকে। স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়রা বেশিরভাগ সময় নিজেদের অর্ধেই রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন।
প্রথমার্ধে ভিনিসিয়ুস আরও একটি গোল করলেও সেটি বাতিল হয়ে যায়। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণ তৈরির সময় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের সঙ্গে সামান্য সংস্পর্শ হয়েছিল। রেফারি সেটিকে ফাউল হিসেবে বিবেচনা করে গোল বাতিল করেন। সিদ্ধান্তটি নিয়ে ম্যাচ শেষে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
গোল বাতিল হলেও ভিনিসিয়ুস থেমে থাকেননি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আবারও স্কটল্যান্ডের জালে বল জড়িয়ে দেন তিনি। দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল পূর্ণ করেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। ফলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় সেলেসাওরা।
দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি ব্রাজিলের হাতে। স্কটল্যান্ড কিছু আক্রমণের চেষ্টা করলেও ব্রাজিলের সংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। গোলরক্ষকও খুব বেশি পরীক্ষার মুখে পড়েননি।
ম্যাচের ৬০তম মিনিটে ব্রাজিলের তৃতীয় গোলটি আসে মাতেউস কুনিয়ার পা থেকে। ব্রুনো গিমারায়েসের চমৎকার অ্যাসিস্ট থেকে সহজেই বল জালে পাঠান তিনি। এই গোলের পর স্কটল্যান্ডের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
এই ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। তিন ম্যাচে চার গোল করে তিনি এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা পারফর্মার। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং গোল করার ক্ষমতা ব্রাজিলকে বাড়তি শক্তি জুগিয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ভিনিসিয়ুসের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময়। দুই বছর আগের তুলনায় তিনি এখন আরও পরিণত এবং দায়িত্বশীল ফুটবলার। দলের প্রয়োজনে আক্রমণের বিভিন্ন জায়গায় খেলতে পারছেন এবং নিয়মিত গোলও করছেন।
কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ভিনিসিয়ুসের খেলায় বড় পরিবর্তন এসেছে। শুধুমাত্র উইংয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে মাঝামাঝি জায়গায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে গোলের সুযোগ বাড়ছে এবং প্রতিপক্ষের জন্য তাকে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্কটল্যান্ড অবশ্য কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিল। দ্বিতীয়ার্ধে স্কট ম্যাকটমিনের একটি হেড এবং ফার্গুসনের দূরপাল্লার শট কিছুটা বিপদ তৈরি করলেও সেগুলো গোল হয়ে ওঠেনি। ফলে ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগও হারিয়ে ফেলে তারা।
ব্রাজিল আরও কয়েকটি গোল করতে পারত। তবে স্কটল্যান্ডের গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গান অসাধারণ কয়েকটি সেভ করে দলের বড় হার এড়ান। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে ভিনিসিয়ুসের দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তিনি রুখে দেন।
ম্যাচের শেষ দিকে দর্শকদের সবচেয়ে বড় আনন্দের মুহূর্ত আসে নেইমারের মাঠে নামার মাধ্যমে। দীর্ঘ ৯৮২ দিন পর আবার ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নামেন এই তারকা ফুটবলার। চোট কাটিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তন সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
এটি নেইমারের চতুর্থ বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের রেকর্ডও। দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে মাঠে ফিরে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে এখনও জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছেন।
গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে দারুণ পারফরম্যান্স করে ব্রাজিল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নকআউট পর্বে পা রাখছে। দলটির আক্রমণভাগ যেমন দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে, তেমনি রক্ষণভাগও ছিল বেশ শক্তিশালী।
নকআউট পর্বে ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে জাপান, নেদারল্যান্ডস কিংবা সুইডেন। যে দলই সামনে আসুক, বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ব্রাজিলকে অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ব্রাজিল সবসময়ই বড় মঞ্চের দল। এবারও তাদের খেলা দেখে মনে হচ্ছে শিরোপার জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুসের দুর্দান্ত ফর্ম এবং নেইমারের প্রত্যাবর্তন দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের এই জয় শুধু গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দই দেয়নি, বরং পুরো টুর্নামেন্টের জন্য একটি শক্ত বার্তাও দিয়েছে। সেলেসাওরা যে এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে, সেটি আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


























