প্রাইভেট পড়া কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল। তিনি বলেছেন, শিক্ষকেরা যদি শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পাঠ ভালোভাবে বুঝিয়ে দেন, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বাইরে প্রাইভেট বা কোচিং করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। রোববার বিকেলে নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া অনার্স কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ কমানোর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় শ্রেণিকক্ষের পাঠদান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কিংবা এমপিওভুক্তির আবেদনে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন। সেখানে প্রতিষ্ঠানকে বলতে হবে, তাদের শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মতভাবে পাঠদান করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের বাইরে প্রাইভেট পড়ার প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু অবকাঠামো বা ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ থেকে কতটা কার্যকর শিক্ষা পাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষকরা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি শিক্ষাব্যয়ের চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও নিজেদের অবসর সময় আরও স্বাস্থ্যকর ও সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও শারীরিক-মানসিক বিকাশের সুযোগ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন ফারজানা শারমীন পুতুল। তিনি বলেন, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় প্রাইভেট পড়ার পেছনে ব্যয় না করে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল কাজে সময় দিতে পারে। এতে তাদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি মানসিক বিকাশও ঘটবে। অভিভাবকদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতিরিক্ত কোচিং বা প্রাইভেটের খরচ অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে। শ্রেণিকক্ষেই যদি পাঠ বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে শিক্ষার্থী, পরিবার এবং শিক্ষক—তিন পক্ষই উপকৃত হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পাঠদানের মান ও নিয়মিত তদারকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু কাগজে-কলমে প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, বাস্তবেও তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কার্যকর যোগাযোগ এবং নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। পাশাপাশি শ্রেণিকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এমন অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অনুষ্ঠানে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানা ধরনের অস্থিরতা থাকলেও জনগণের কল্যাণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও জোরদার করার উদ্যোগ রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা খাতের উন্নয়নকে সামগ্রিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। মতবিনিময় সভায় মোহরকয়া অনার্স কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. ইসমত হোসেন সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক সিদ্দিক আলী মিষ্টু। অনুষ্ঠানে স্থানীয় পর্যায়ের আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা নিয়ে এমন মতবিনিময় সভাকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো. হারুন-অর রশিদ (পাপ্পু), গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মোলাম এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুর রহমান বাবুসহ অনেকে। পুরো আলোচনায় মূল বার্তাটি ছিল—শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা যেন শ্রেণিকক্ষেই নিশ্চিত করা যায়। বাস্তবে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ—সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস, পাঠের মান যাচাই এবং শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রমেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

























