অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য যে নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অনুসরণ করবে না যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের মতো একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, ইসরায়েলি বসতি ইস্যুতে যুক্তরাজ্য যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সেই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে না। তবে এ বিষয়ে এর চেয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে পশ্চিম তীরে সহিংসতা, সংঘাত বা উত্তেজনা আরও বাড়ুক—এমনটা যুক্তরাষ্ট্র চায় না। তার মতে, পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে মঙ্গলবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি এসব বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় ব্রিটিশ সরকার।
যুক্তরাজ্যের নতুন পদক্ষেপের আওতায় শুধু পণ্য আমদানিই নয়, বসতিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের সেবা, অর্থায়ন, নির্মাণ, অবকাঠামো, রিয়েল এস্টেট ও বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের দাবি, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মিলিব্যান্ড বলেন, বসতি সম্প্রসারণের কারণে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়ছে। তাই শুধু উদ্বেগ প্রকাশ না করে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে যুক্তরাজ্য।
ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সামনে আসায় পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের নীতিগত পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
লন্ডন যেখানে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটছে, সেখানে ওয়াশিংটন একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রও পশ্চিম তীরে সহিংসতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরোধিতা করছে বলে জানিয়েছেন রুবিও।
এদিকে যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ফ্রান্স ও কানাডাও ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে। আরও কয়েকটি দেশ বসতি নিয়ে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে অবস্থান জানিয়েছে। মোট ১২টি দেশ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে নতুন পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার সিদ্ধান্তের পর ইসরায়েলও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার জানিয়েছেন, পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে কয়েকজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও নাগরিকের ওপর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলি সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, পশ্চিম তীরে বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ একতরফা এবং এর মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ কনস্যুলেটটি পশ্চিম তীর ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এটি বন্ধের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের বিষয়। জাতিসংঘসহ অধিকাংশ দেশ এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করে। তবে ইসরায়েল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে এবং পশ্চিম তীরের মর্যাদা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান পোষণ করে।
বিশেষ করে পশ্চিম তীরের E1 এলাকায় বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ওই এলাকায় বড় ধরনের বসতি সম্প্রসারণ হলে পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলি বসতি ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের কঠোর অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন নীতি পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে মতপার্থক্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সময়ে ইসরায়েলের পাল্টা কূটনৈতিক পদক্ষেপে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ফলে পশ্চিম তীরের বসতি ইস্যুতে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিই এখন নজরের বিষয়।




























