ক্যানসার ফিরে আসে—এই কথাটি শুনলেই একজন রোগী বা তাঁর পরিবারের মনে আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর রিপোর্টে ক্যানসারের কোনো লক্ষণ না থাকলে স্বস্তি আসে। কিন্তু কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি অনেক সময় আরও দীর্ঘ সময় পরও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার আবার শনাক্ত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ক্যানসার রিকারেন্স বা পুনরাবির্ভাব বলা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে আগের চিকিৎসা ভুল ছিল বা একেবারেই কাজ করেনি।
কেন ক্যানসার ফিরে আসে—এর অন্যতম কারণ হতে পারে শরীরে থেকে যাওয়া অতি ক্ষুদ্র ক্যানসার কোষ। অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের পর পরীক্ষায় টিউমার দেখা না গেলেও কিছু কোষ এতটাই ছোট পরিমাণে থাকতে পারে যে সাধারণ স্ক্যান বা পরীক্ষায় সেগুলো ধরা পড়ে না। এই অবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রে মিনিমাল বা মেজারেবল রেসিডুয়াল ডিজিজ বা MRD বলা হয়। বিশেষ করে রক্তের কিছু ক্যানসারে অত্যন্ত সংবেদনশীল পরীক্ষার মাধ্যমে এ ধরনের কোষ শনাক্ত করা যায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুপ্ত ক্যানসার কোষ। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্যানসার কোষ শরীরের কোথাও ছড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকতে পারে। মাস, বছর এমনকি কয়েক দশক পরও পরিবেশ অনুকূল হলে এসব কোষ আবার সক্রিয় হয়ে টিউমার তৈরি করতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, কোষের আশপাশের পরিবেশসহ বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া এতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঠিক কী কারণে কোনো সুপ্ত কোষ আবার সক্রিয় হয়, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
ক্যানসার ফিরে আসে সাধারণত তিন ধরনের পুনরাবির্ভাব হিসেবে দেখা যেতে পারে। আগের টিউমারের জায়গাতেই আবার দেখা দিলে তাকে স্থানীয় বা local recurrence বলা হয়। কাছাকাছি লিম্ফ নোড বা টিস্যুতে দেখা দিলে সেটি regional recurrence। আর শরীরের অন্য কোনো অঙ্গে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে তাকে distant recurrence বলা হয়। নতুন করে ক্যানসার ধরা পড়লেই সেটি পুরোনো ক্যানসারের পুনরাবির্ভাব—এমনটাও নিশ্চিত নয়; কখনো এটি সম্পূর্ণ নতুন বা second primary cancer হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা বা বায়োপসি করতে পারেন।
আধুনিক চিকিৎসায় ক্যানসার শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের পদ্ধতিও দ্রুত বদলাচ্ছে। লিকুইড বায়োপসি, circulating tumor DNA বা ctDNA এবং কিছু ক্ষেত্রে MRD-ভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে থাকা অতি ক্ষুদ্র রোগের চিহ্ন খুঁজে বের করার গবেষণা চলছে। তবে সব ধরনের ক্যানসারের জন্য এসব পরীক্ষা এখনো নিয়মিত বা সমানভাবে উপযোগী নয়। তাই ইন্টারনেটে কোনো পরীক্ষা দেখে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে রোগের ধরন, পর্যায় ও চিকিৎসার ইতিহাস অনুযায়ী অনকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, পাঁচ বছর ক্যানসারের কোনো লক্ষণ না থাকা অবশ্যই বড় অর্জন, কিন্তু সেটিকে সবার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ক্যানসার ফিরে আসে কি না, তার ঝুঁকি নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন, পর্যায়, চিকিৎসার ফল এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর। তাই চিকিৎসা শেষ হলেও নিয়মিত ফলোআপ, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা এবং নতুন বা দীর্ঘস্থায়ী অস্বাভাবিক উপসর্গ সম্পর্কে চিকিৎসককে জানানো জরুরি। ক্যানসার ফিরে এলেও চিকিৎসার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে থাকে—কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি বা অন্যান্য পদ্ধতিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।



























