জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে আগামী এক বছরের জন্য জাতিসংঘের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল বৈশ্বিক ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পেলেন বাংলাদেশের এই কূটনীতিক।
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত ৯টার পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তি এবং ৮১তম অধিবেশনের নতুন সভাপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. খলিলুর রহমান আগামী এক বছর সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও ঐকমত্য তৈরিতে সভাপতির ভূমিকা পালন করবেন।
শপথ গ্রহণের আগে বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ড. খলিলুর রহমান। সেখানে তিনি ৮১তম অধিবেশনের কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁর পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। জাতিসংঘের কার্যক্রমে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
শপথ গ্রহণের পরই শুরু হয় তাঁর নতুন দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। বাংলাদেশ সময় বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১টায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রথম প্লেনারি সভায় সভাপতিত্ব করবেন ড. খলিলুর রহমান। এ সভার মধ্য দিয়েই নতুন অধিবেশনের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
এর আগে গত ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন ড. খলিলুর রহমান। গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকুরিসকে পরাজিত করেন। খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট, আর কাকুরিস পান ৯১ ভোট।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি পাঁচটি আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মধ্যে ঘুরে ঘুরে নির্ধারিত হয়। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল। নির্বাচনের পর ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরের জন্য দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল খলিলুর রহমানের।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নতুন নয়। তবে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও এ দায়িত্ব পেল বাংলাদেশ। এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রায় চার দশক পর আবারও বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি এই দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
ড. খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের কূটনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ফলে সভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা পরিচালনা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৮১তম অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানবাধিকারসহ নানা আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা এবং বিভিন্ন সংকটে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা অংশ নিয়ে নিজেদের দেশের অবস্থান ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে বক্তব্য দেবেন। ফলে ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।
ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর জানিয়েছিলেন, তিনি সব সদস্যরাষ্ট্রের সভাপতি হিসেবে কাজ করতে চান এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মতামতের পরিবর্তে নিরপেক্ষতা ও অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দেবেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদ ও সভাপতির দায়িত্বসংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ করে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক ঘটনা। আগামী এক বছর তাঁর নেতৃত্বে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম কীভাবে এগোয়, সেদিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।




























