ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার সময় নয়, মস্তিষ্কের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পুনরুদ্ধারের পর্যায়। দিনের বেলায় মস্তিষ্কের কোষগুলো কাজ করার সময় বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয়। ঘুমের সময় সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা CSF-এর তরঙ্গ এই বর্জ্য অপসারণে ভূমিকা রাখে।
নতুন এক গবেষণায় গবেষকরা দেখেছেন, ঘুমের নির্দিষ্ট সময়ে খুব অল্প সময়ের জন্য ‘পিংক নয়েজ’ বা কোমল স্ট্যাটিক ধরনের শব্দ ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের ধীর বৈদ্যুতিক তরঙ্গ এবং CSF-এর তরঙ্গ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
পিংক নয়েজ কী?
পিংক নয়েজ এমন এক ধরনের শব্দ, যাতে মানুষের শোনার সীমার সব ফ্রিকোয়েন্সি থাকে। তবে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির তুলনায় নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তুলনামূলক বেশি জোরালো থাকে।
ফলে এর শব্দ অনেকটা হালকা বৃষ্টি, বাতাস বা দূরের ঝরনার মতো কোমল শোনাতে পারে। গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছিল মাত্র ৫০ মিলিসেকেন্ডের ছোট ছোট পিংক নয়েজের শব্দ।
তবে গবেষণাটি সাধারণভাবে দীর্ঘ সময় পিংক নয়েজ শুনে ঘুমানোর প্রভাব নিয়ে ছিল না। বরং গবেষকরা ঘুমের সময় মস্তিষ্কের ধীর তরঙ্গের নির্দিষ্ট মুহূর্ত শনাক্ত করে ঠিক সেই সময়ে শব্দ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
মস্তিষ্কের বর্জ্য কীভাবে পরিষ্কার হয়?
সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড হলো স্বচ্ছ এক ধরনের তরল, যা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডকে ঘিরে থাকে। এটি মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি পুষ্টি পরিবহন এবং কোষের তৈরি কিছু বর্জ্য অপসারণেও ভূমিকা রাখে।
আগের গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সময় CSF-এর তরঙ্গ মস্তিষ্কের ‘স্লো ওয়েভ’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এই ধীর বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বিশেষ করে গভীর নন-REM ঘুমের সময় বেশি দেখা যায়।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন, এই মস্তিষ্কের তরঙ্গকে নির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে প্রভাবিত করা গেলে CSF-এর প্রবাহও বাড়ানো সম্ভব কি না।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
MIT-এর গবেষকরা ১৪ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীর ওপর পরীক্ষা চালান। তাদের ঘুমের সময় এমনভাবে পিংক নয়েজ দেওয়া হয়, যাতে শব্দটি তাদের জাগিয়ে না তোলে।
গবেষণায় দেখা যায়, সঠিক সময়ে দেওয়া এই শব্দ মস্তিষ্কের ধীর বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাত্রা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে CSF তরঙ্গের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়।
গবেষকদের মতে, ধীর মস্তিষ্কের তরঙ্গ রক্তনালির সংকোচন ও প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই পরিবর্তনগুলো এক ধরনের পাম্পের মতো কাজ করে মস্তিষ্কের ভেতর CSF প্রবাহে সহায়তা করতে পারে।
আলঝেইমারের ক্ষেত্রেও কি কাজে আসতে পারে?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে পিংক নয়েজ আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করতে পারে। গবেষণাটি মূলত সুস্থ মানুষের ঘুমের সময় CSF প্রবাহ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের অনুসন্ধান।
তবে গবেষকদের আগ্রহের একটি কারণ হলো আলঝেইমারসহ কিছু নিউরোডিজেনারেটিভ রোগে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড-বিটা ও টাউয়ের মতো ক্ষতিকর প্রোটিন জমা হতে পারে। মস্তিষ্কের বর্জ্য অপসারণের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা গেলে ভবিষ্যতে এসব রোগের ক্ষেত্রে কোনো উপকার পাওয়া যায় কি না, সেটি গবেষণার বিষয় হতে পারে।
ঘুমের জন্য এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গবেষকরা এখন জানতে চান, CSF প্রবাহ বাড়ানোর এই পদ্ধতি অনিদ্রায় ভোগা মানুষদের আরও পুনরুদ্ধারমূলক ঘুম পেতে সাহায্য করতে পারে কি না।
গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শব্দের সময়। শুধু পিংক নয়েজ শোনানো নয়, বরং মস্তিষ্কের স্লো ওয়েভের নির্দিষ্ট পর্যায়ে শব্দটি দেওয়াই ছিল পরীক্ষার মূল কৌশল।
গবেষকরা ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তি তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন, যা হেডব্যান্ডের মতো ডিভাইসের মাধ্যমে ঘুমের সময় মস্তিষ্কের তরঙ্গ শনাক্ত করে সঠিক মুহূর্তে অডিও স্টিমুলেশন দিতে পারবে।
তবে এটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। তাই পিংক নয়েজ শুনলেই মস্তিষ্কের বর্জ্য পরিষ্কার হবে বা স্মৃতিশক্তি বাড়বে—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

























