ফুটবল কোচদের জীবন বাইরে থেকে যতটা চাকচিক্যময় মনে হয়, বাস্তবে তার অনেকটাই ছুটে চলে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে। ম্যাচের ফল, পয়েন্ট টেবিল, খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স, সমর্থকদের প্রত্যাশা—সবকিছুর হিসাব রাখতে হয় একজন কোচকে। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, হোটেলে থাকা কিংবা পরিবার থেকে দূরে থাকার বাস্তবতা, তাহলে কোচিং পেশার ছবিটা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ইংলিশ ফুটবলে এমন জীবনের উদাহরণ কম নেই। ফ্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড থেকে টনি পুলিস—অনেক কোচকেই কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে তৈরি করতে হয়েছে আলাদা এক ভারসাম্য।
কভেন্ট্রি সিটির কোচ ফ্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের জীবনেও রয়েছে এমন দূরত্বের গল্প। ক্লাবের দায়িত্ব সামলালেও তাঁর পরিবারের আবাস লন্ডনে। ফলে কাজের জায়গা আর পারিবারিক জীবনের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয় তাঁকে। এর আগে ইংলিশ ফুটবলে হোসে মরিনিওর জীবনেও দেখা গেছে ভিন্ন ধরনের বন্দোবস্ত। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ থাকার সময় তিনি দীর্ঘ সময় হোটেলে থেকেছেন। অর্থাৎ ক্লাবের ব্যস্ততা শেষ হলেও কোচের দিন শেষ হয়ে যায় না। অনেক সময় কাজের শহরের হোটেল কিংবা গাড়িই হয়ে ওঠে তাঁর দ্বিতীয় কর্মস্থল। মাঠের পরিকল্পনা থেকে পরের ম্যাচের প্রস্তুতি—সবই চলতে থাকে সেখান থেকে।
লিভারপুলের কোচ হিসেবে আর্নে স্লটও কাজের সঙ্গে পরিবারের দূরত্ব সামলানোর আলাদা ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের হেল এলাকায় বাসা নিয়েছিলেন। সেখান থেকে লিভারপুলের অনুশীলনকেন্দ্রে যাতায়াত করতে সময় লাগত। তবে ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরের কাছাকাছি থাকায় নেদারল্যান্ডসে থাকা স্ত্রী-সন্তানদের কাছে যাওয়ার সুযোগও তুলনামূলক সহজ ছিল। একজন কোচের কাছে এমন সিদ্ধান্ত কেবল বাসা বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারকে কতটা সময় দেওয়া যাবে, ম্যাচের আগে কতটা বিশ্রাম পাওয়া যাবে এবং প্রতিদিনের যাতায়াত কীভাবে কাজের ওপর প্রভাব ফেলবে—সেসব হিসাবও। এভাবেই ফুটবল কোচদের জীবন হয়ে ওঠে একাধিক দায়িত্বের সমন্বয়।
এই জায়গায় টনি পুলিসের গল্পটি আরও ব্যতিক্রমী। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে নিজের পরিবারের বাড়ি ধরে রেখে কোচিং ক্যারিয়ার চালিয়েছেন তিনি। স্টোক সিটিতে কাজ করার সময় নিয়মিত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। পরে মিডলসব্রোতে দায়িত্ব নেওয়ার পর যাতায়াতের দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। কিন্তু পুলিসের কাছে গাড়িতে কাটানো সেই দীর্ঘ সময় ছিল শুধু ভ্রমণ নয়, কাজেরও অংশ। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর গাড়িতে উঠেই সহকারীদের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করতেন। ম্যাচের ভুল-ত্রুটি, পরের প্রতিপক্ষের কৌশল, খেলোয়াড়দের অবস্থা—সবকিছু নিয়ে তখনই শুরু হয়ে যেত পরিকল্পনা।
পুলিসের বর্ণনা অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে গাড়ির নিরিবিলি পরিবেশে ম্যাচ নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবার সুযোগ পেতেন তিনি। সহকারীদের সঙ্গে আলোচনা শেষ হলে পরবর্তী প্রতিপক্ষ নিয়ে স্কাউটিং রিপোর্টও আসত। কোন দল কীভাবে খেলছে, কোথায় তাদের শক্তি, কোথায় দুর্বলতা—এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বাড়ির পথে এগোতেন তিনি। বাড়ি পৌঁছানোর পরও কাজ থামত না। টেলিভিশনে বসে প্রতিপক্ষের আগের ম্যাচের রেকর্ডিং দেখা, পরের দিনের পরিকল্পনা করা—সবই চলত। তবে সপ্তাহের একটি দিন পরিবারকে দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। অর্থাৎ দীর্ঘ যাত্রার মধ্যেও কাজ ও পরিবারের জন্য আলাদা সময় ধরে রাখাই ছিল তাঁর পদ্ধতি।
ফুটবল কোচদের জীবন তাই শুধু মাঠের ৯০ মিনিট কিংবা সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেওয়ার গল্প নয়। এর পেছনে থাকে অসংখ্য ঘণ্টার প্রস্তুতি, ভ্রমণ, ভিডিও বিশ্লেষণ, ফোনে আলোচনা এবং পরিবারের জন্য সময় বের করার চেষ্টা। অনেক কোচের কাছে গাড়ির দীর্ঘ পথও হয়ে ওঠে চিন্তা ও পরিকল্পনার সময়। আবার কারও জন্য হোটেলই হয়ে যায় সাময়িক বাড়ি। BBC Sport-এর মতো ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমে কোচদের এই পেশাগত জীবনের নানা দিক নিয়মিত উঠে আসে। আপনার সাইটের সংশ্লিষ্ট ইংলিশ ফুটবল, প্রিমিয়ার লিগ ও ফুটবল কোচিং বিষয়ক পুরোনো প্রতিবেদনগুলোতে এই কপির ভেতর থেকে অভ্যন্তরীণ লিংক যোগ করা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোচের কাজ শুধু দলকে মাঠে নামানো নয়; মাঠের বাইরে নিজের সময়, পরিবার ও দায়িত্ব—তিনটিকেই সামলে এগিয়ে চলাও এই পেশার বড় অংশ।




























