ঢাকা ০২:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo লন্ডনে গাড়ির ভেতর গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি, তদন্তে পুলিশ Logo জ্বালানি ও অর্থ খাতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে বাংলাদেশ-কাতার একমত Logo রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চান মির্জা ফখরুল। Logo বেপরোয়া গাড়ির ধাওয়া, হাটহাজারীতে থামিয়ে ভাঙচুর Logo বিশ্বকাপজয়ী রদ্রিকে দলে নিয়ে বার্সেলোনার বড় চমক Logo গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ, কঠিন সময়ে সরকার Logo ডা. দীপু মনি’র স্বামী: ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের ইন্তেকাল Logo প্রধান প্রকৌশলী পদ ঘিরে ইইডিতে তৎপরতা, আলোচনায় বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতা Logo ইউল্যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী Logo আরহাম রহমানের ফর্মুলা ফোর জয় বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস

তেলসংকটের পর চীনের ইভির উত্থান, বিশ্ববাজারে চাপ

তেলসংকটের পর চীনের ইভির উত্থান, বিশ্ববাজারে চাপ

তেল ও গ্যাসের বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি (EV) এখন আর শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়—এটি হয়ে উঠছে বর্তমান বাস্তবতা। আর এই পরিবর্তনের নেতৃত্বে রয়েছে চীন। সাম্প্রতিক বেইজিং অটো শোতে চীনের গাড়ি নির্মাতারা যেসব নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তুলে ধরেছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—বিশ্ব অটো শিল্পে এক নতুন যুগ শুরু হতে যাচ্ছে।

প্রদর্শনীতে দেখা গেছে, আধুনিক স্মার্ট এসইউভিতে যান্ত্রিক পা-মালিশের মতো সুবিধা থেকে শুরু করে বিলাসবহুল মিনিভ্যানে সম্পূর্ণ কাস্টমাইজযোগ্য আসন ব্যবস্থা। কিছু গাড়িতে রয়েছে উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেমসহ কারাওকে সুবিধা, আবার কিছু গাড়ির হেডলাইট দিয়েই দেয়ালে সিনেমা প্রজেক্ট করা যায়। এমনকি তুলনামূলক সাশ্রয়ী মডেলেও স্মার্ট ড্রাইভিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।

এই প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য শুধু ভোক্তাদের আকর্ষণ করছে না, বরং বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে। চীনের গাড়ি কোম্পানিগুলো বৃহৎ পরিসরে কম খরচে উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়ায় তাদের দাম তুলনামূলক কম। ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত বাজার দখল করছে তারা।

বিশ্বজুড়ে চলমান তেলসংকট এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে অনেক দেশ ও ভোক্তা বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির দিকে ঝুঁকছে। চীনের কোম্পানিগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

বর্তমানে চীনে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির অর্ধেকেরও বেশি ইভি বা হাইব্রিড। বড় শহরগুলোতে কমে যাচ্ছে ইঞ্জিনচালিত গাড়ির শব্দ, তার জায়গা নিচ্ছে বৈদ্যুতিক মোটরের নীরবতা। তবে অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা ও মূল্যযুদ্ধের কারণে মুনাফা কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো বিদেশমুখী হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের ইভি রপ্তানি প্রায় ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপীয় বাজারে তাদের প্রবৃদ্ধি আরও চোখে পড়ার মতো। সেখানে তুলনামূলক কম শুল্ক এবং প্রযুক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কারণে চীনা ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এখনো চীনা কোম্পানির জন্য কঠিন। উচ্চ শুল্ক, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং সফটওয়্যার সীমাবদ্ধতার কারণে চীনের গাড়ি প্রবেশে বড় বাধা রয়েছে। এমনকি অনেক মার্কিন আইনপ্রণেতা চীনা গাড়িকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।

চীনের ইভি শিল্পের বড় শক্তি হলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা। শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কারখানা এবং সরকারের দীর্ঘদিনের সহায়তা—সব মিলিয়ে তারা দ্রুত এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারছে। যদিও সমালোচকরা এটিকে অসম প্রতিযোগিতা বলে উল্লেখ করছেন, চীনা কোম্পানিগুলো এটিকে নিজেদের দক্ষতা হিসেবে তুলে ধরছে।

শুধু উৎপাদন নয়, প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও চীন এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। একসময় বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তারা নিজেরাই নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে এবং তা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্বচালিত গাড়ি, স্মার্ট ড্রাইভিং সিস্টেম এবং ইকোসিস্টেমভিত্তিক সেবা—সব ক্ষেত্রেই তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও। বৈশ্বিক অটো শিল্পে আধিপত্য বিস্তার করে চীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব বাড়াতে চায়। ইভি খাত হতে পারে সেই লক্ষ্য পূরণের অন্যতম হাতিয়ার।

সব মিলিয়ে বলা যায়, তেলসংকট বৈশ্বিক অটো শিল্পে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উঠে এসেছে চীন। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি দৌড়ে তারা কতটা এগোতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

লন্ডনে গাড়ির ভেতর গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি, তদন্তে পুলিশ

তেলসংকটের পর চীনের ইভির উত্থান, বিশ্ববাজারে চাপ

Update Time : ০৮:০২:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬

তেল ও গ্যাসের বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি (EV) এখন আর শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়—এটি হয়ে উঠছে বর্তমান বাস্তবতা। আর এই পরিবর্তনের নেতৃত্বে রয়েছে চীন। সাম্প্রতিক বেইজিং অটো শোতে চীনের গাড়ি নির্মাতারা যেসব নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তুলে ধরেছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—বিশ্ব অটো শিল্পে এক নতুন যুগ শুরু হতে যাচ্ছে।

প্রদর্শনীতে দেখা গেছে, আধুনিক স্মার্ট এসইউভিতে যান্ত্রিক পা-মালিশের মতো সুবিধা থেকে শুরু করে বিলাসবহুল মিনিভ্যানে সম্পূর্ণ কাস্টমাইজযোগ্য আসন ব্যবস্থা। কিছু গাড়িতে রয়েছে উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেমসহ কারাওকে সুবিধা, আবার কিছু গাড়ির হেডলাইট দিয়েই দেয়ালে সিনেমা প্রজেক্ট করা যায়। এমনকি তুলনামূলক সাশ্রয়ী মডেলেও স্মার্ট ড্রাইভিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।

এই প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য শুধু ভোক্তাদের আকর্ষণ করছে না, বরং বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে। চীনের গাড়ি কোম্পানিগুলো বৃহৎ পরিসরে কম খরচে উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়ায় তাদের দাম তুলনামূলক কম। ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত বাজার দখল করছে তারা।

আরও পড়ুন  বাজেট বাস্তবায়নেই সাফল্য, কর্মকর্তাদের কাজের আহ্বান অর্থমন্ত্রীর

বিশ্বজুড়ে চলমান তেলসংকট এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে অনেক দেশ ও ভোক্তা বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির দিকে ঝুঁকছে। চীনের কোম্পানিগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

বর্তমানে চীনে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির অর্ধেকেরও বেশি ইভি বা হাইব্রিড। বড় শহরগুলোতে কমে যাচ্ছে ইঞ্জিনচালিত গাড়ির শব্দ, তার জায়গা নিচ্ছে বৈদ্যুতিক মোটরের নীরবতা। তবে অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা ও মূল্যযুদ্ধের কারণে মুনাফা কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো বিদেশমুখী হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের ইভি রপ্তানি প্রায় ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপীয় বাজারে তাদের প্রবৃদ্ধি আরও চোখে পড়ার মতো। সেখানে তুলনামূলক কম শুল্ক এবং প্রযুক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কারণে চীনা ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম ওয়াসা: সিস্টেম লসে ৭৮ কোটি টাকার পানি

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এখনো চীনা কোম্পানির জন্য কঠিন। উচ্চ শুল্ক, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং সফটওয়্যার সীমাবদ্ধতার কারণে চীনের গাড়ি প্রবেশে বড় বাধা রয়েছে। এমনকি অনেক মার্কিন আইনপ্রণেতা চীনা গাড়িকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।

চীনের ইভি শিল্পের বড় শক্তি হলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা। শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কারখানা এবং সরকারের দীর্ঘদিনের সহায়তা—সব মিলিয়ে তারা দ্রুত এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারছে। যদিও সমালোচকরা এটিকে অসম প্রতিযোগিতা বলে উল্লেখ করছেন, চীনা কোম্পানিগুলো এটিকে নিজেদের দক্ষতা হিসেবে তুলে ধরছে।

আরও পড়ুন  চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা অপূর্ণই রইল, হারাচ্ছে বৈশ্বিক বাজার

শুধু উৎপাদন নয়, প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও চীন এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। একসময় বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তারা নিজেরাই নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে এবং তা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্বচালিত গাড়ি, স্মার্ট ড্রাইভিং সিস্টেম এবং ইকোসিস্টেমভিত্তিক সেবা—সব ক্ষেত্রেই তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও। বৈশ্বিক অটো শিল্পে আধিপত্য বিস্তার করে চীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব বাড়াতে চায়। ইভি খাত হতে পারে সেই লক্ষ্য পূরণের অন্যতম হাতিয়ার।

সব মিলিয়ে বলা যায়, তেলসংকট বৈশ্বিক অটো শিল্পে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উঠে এসেছে চীন। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি দৌড়ে তারা কতটা এগোতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।