মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। দেশের জ্বালানি চাহিদা স্বাভাবিক রাখতে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে আরও ১ লাখ টন ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানিরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা দেশের চলমান সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘জরুরি চাহিদা পূরণে’ এই আমদানি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। বৈঠকটি জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এর আগে গত ২১ এপ্রিল একই কমিটির বৈঠকে দেড় লাখ টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, যা পরিস্থিতির গুরুত্বই নির্দেশ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ হয়ে থাকে। সেখানে বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ওপর।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক জায়গায় ডিজেল ও অকটেনের ঘাটতির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা। সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা চালিয়ে গেলেও বৈশ্বিক চাপ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হয়নি।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশেও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। বর্তমানে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে মে মাসেও জ্বালানির মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক নির্ভরতা কিছুটা কমানো যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত আমদানি সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে, নতুন করে ডিজেল ও অকটেন আমদানির সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত থাকায় বাজারে নজরদারি ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা জরুরি।



























