চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি সঠিকভাবে সামাল দিতে ব্যর্থ হলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক অবস্থান এবং তাইওয়ানকে ঘিরে বাড়তে থাকা সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এ মন্তব্য করলেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শি জিনপিং তাইওয়ান ইস্যুকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শি জিনপিং বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি যদি দুই দেশ বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে, তাহলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে ভুল সিদ্ধান্ত বা উসকানিমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “তাইওয়ানের স্বাধীনতা তাইওয়ান প্রণালির শান্তির সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।” একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তাইওয়ান প্রণালির শান্তি ও স্থিতিশীলতা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলোর একটি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য সফর এবং যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান নীতিকে কেন্দ্র করেই চীনের এই কড়া বার্তা এসেছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে, যা বেইজিংকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
তাইওয়ানকে চীন নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে আসছে। যদিও তাইওয়ান একটি স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ এবং তাদের নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। বেইজিং বরাবরই বলে আসছে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করেও তারা তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধবিমান, নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং ক্ষেপণাস্ত্র মহড়ার কারণে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ ও তাদের মিত্র দেশগুলোও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে চীনের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওয়ান চায়না পলিসি’ মেনে চললেও তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়। এতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং।
চীন অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান ইস্যুতে অযথা হস্তক্ষেপ করছে এবং অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিধর দুই দেশ—চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—এই ইস্যুতে বিপরীত অবস্থানে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এদিকে ট্রাম্পকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি। তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরলে তাইওয়ান প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন সম্ভাবনাও চীনকে বাড়তি সতর্ক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে ছোট কোনো কূটনৈতিক ভুলও বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। তাইওয়ান প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান যত কঠোর হচ্ছে, ততই বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা।
তবে অনেকেই মনে করছেন, উভয় দেশই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। কারণ চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। সামরিক সংঘাত হলে এর প্রভাব শুধু এশিয়া নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সফরকে ঘিরে তাইওয়ান ইস্যুতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শি জিনপিংয়ের সতর্কবার্তা সেই উত্তেজনাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন আন্তর্জাতিক মহল নজর রাখছে, ওয়াশিংটন ও বেইজিং ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয় এবং তাইওয়ান প্রশ্নে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।





























