পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে সৌদি আরবে। সোমবার ৮ জিলহজ থেকে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো হজযাত্রী মক্কা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। ধর্মীয় আবেগ, ইবাদত ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় মুসলমানদের এই মহাসমাবেশে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ।
সৌদি সংবাদমাধ্যম সৌদি গেজেট জানিয়েছে, গতকাল রোববার রাত থেকেই হজযাত্রীরা তালবিয়া পাঠ করতে করতে মিনার পথে রওনা হন। “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মক্কার আশপাশের এলাকা। হজের প্রথম ধাপ হিসেবে মিনায় অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মিনাকে বলা হয় তাঁবুর নগরী। প্রতিবছর হজ মৌসুমে এই এলাকায় লাখো অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করা হয়, যেখানে হজযাত্রীরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবস্থান করেন। বিশাল এই তাঁবুনগরীতে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, খাবার ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনায় বিশেষ প্রস্তুতি নেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লাখের বেশি হজযাত্রী ইতোমধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। তাদের সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ হজযাত্রীরাও যোগ দিয়েছেন। ফলে পবিত্র নগরী মক্কা ও আশপাশের এলাকায় এখন মুসল্লিদের পদচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে প্রশাসন।
হজযাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাত্রা নিশ্চিত করতে আগেভাগেই সম্পন্ন করা হয়েছে পরিবহন ও আবাসনের সব প্রস্তুতি। মিনায় প্রবেশের জন্য নির্ধারিত রুট, বাস সার্ভিস এবং গাইডলাইন অনুসরণে কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা। হজযাত্রীদের সঠিক তাঁবুতে পৌঁছে দিতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থাও চালু রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিটি তাঁবুতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুর পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম ও নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
হজ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম মুসলমানদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন ফরজ। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন এই পবিত্র সফরে অংশ নেওয়ার জন্য।
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, ৮ জিলহজকে বলা হয় ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’। এই দিন থেকেই হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। হজযাত্রীরা মিনায় গিয়ে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও পরদিন ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং অধিকাংশ সময় ইবাদত-বন্দেগিতে কাটান।
মিনায় অবস্থানের পর ৯ জিলহজ হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। আরাফাতে অবস্থানকে হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন হিসেবে ধরা হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ এই আরাফাতের ময়দানেই দিয়েছিলেন।
আরাফাতে অবস্থানের পর সূর্যাস্তের পরে হাজিরা মুজদালিফায় রওনা হন। সেখানে রাতযাপন ও শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের জন্য পাথর সংগ্রহ করেন তারা। এরপর মিনায় ফিরে জামারাতে শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
হজের সময় লাখো মানুষের সমাগম হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সৌদি সরকার। দেশটির বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী, সিভিল ডিফেন্স ও স্বেচ্ছাসেবীরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার বিষয়েও বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজযাত্রীদের জন্য হাসপাতাল, মেডিকেল ক্যাম্প এবং অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে যাতে কেউ অসুস্থ না হন, সে জন্য পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসল্লিদের জন্য ভাষাভিত্তিক সহায়তা কেন্দ্রও চালু করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন ভাষায় নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা হচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া হাজিদের খুঁজে বের করতেও প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকেও এবার বিপুলসংখ্যক হজযাত্রী সৌদি আরবে গেছেন। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় তারা হজ পালন করছেন। বাংলাদেশি হাজিদের জন্য আলাদা গাইডলাইন ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ হজ মিশন।
হজযাত্রীরা জানিয়েছেন, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন সময় পার করছেন তারা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পবিত্র কাবাঘর জিয়ারত এবং হজ পালনের সুযোগ পেয়ে তারা মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন। অনেকেই মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও ক্ষমা কামনা করে দোয়া করছেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এ বছরের হজ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হবে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসলমানদের মিলনমেলায় ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও মানবতার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঈদুল আজহার মধ্য দিয়ে শেষ হবে পবিত্র হজের মূল কার্যক্রম। এরপর ধাপে ধাপে নিজ নিজ দেশে ফিরতে শুরু করবেন হজযাত্রীরা। মুসলিম বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে এই সময়টি ধর্মীয় আবেগ ও আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে।





























