মার্কিন প্রশাসন ও রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাব বহু দশকের আলোচিত বিষয়। হোয়াইট হাউস বা কংগ্রেসের পাশাপাশি লবিং সংস্থা, নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক অর্থায়ন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রেও ইসরাইলপন্থি বিভিন্ন সংগঠন সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ঠেকাতে ইসরাইলপন্থি গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় ছিল। তার অভিযোগ, চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে তার ওপর হামলার চেষ্টাও হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের কিছু কর্মকর্তা ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন।
এ ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, মার্কিন প্রশাসন ও রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাব কতটা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কাউন্টারফায়ার–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিন ইস্যুকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাদের মতে, এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন–এর এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন নীতিতে ইসরাইলপন্থি লবিগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক কৌশলগত বিষয়ে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরাইলপন্থি সংগঠন হিসেবে পরিচিত আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (AIPAC)। এছাড়া আমেরিকান জুইস কমিটি (AJC), এন্টি-ডিফেমেশন লিগ (ADL), জে স্ট্রিট, ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরাইল (CUFI) এবং জায়োনিস্ট অর্গানাইজেশন অব আমেরিকা (ZOA)-সহ আরও কয়েকটি সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয়। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসি ও ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ-এর মতো থিংক ট্যাংকও এ বিষয়ে গবেষণা ও নীতিগত সুপারিশ দিয়ে থাকে।
মার্কিন কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এসব সংগঠন কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, নীতিগত অ্যাডভোকেসি, জনমত গঠন এবং আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাজ করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতিতে তাদের অবস্থান তুলে ধরতে নিয়মিত লবিং কার্যক্রম পরিচালনা করে।
তবে ইসরাইলি লবির প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একক মত নেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জন মিয়ারশেইমার ও স্টিফেন ওয়াল্ট মনে করেন, ইসরাইলপন্থি লবিগুলো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূত ডেনিস রস বলেন, এসব সংগঠনের প্রভাব থাকলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের পর ইসরাইলপন্থি লবির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নীতিনির্ধারণে লবিং একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও সেটিই একমাত্র সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে—এমন দাবি সর্বজনস্বীকৃত নয়।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন, কাউন্টারফায়ার ও বেলফার সেন্টার।



























