ঢাকা ০৮:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হারাম লাইফস্টাইল: শখের জীবন কি আপনাকে হারামের ঝুঁকিতে ফেলছে?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৭:৪৪:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
  • ৫১৪

সামর্থ্যের বাইরে জীবনযাপন ইসলাম কীভাবে মূল্যায়ন করে। ছবি: সংগৃহীত

হারাম লাইফস্টাইল শুধু কোনো খাবার বা কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনযাপন, অর্থ ব্যয় ও উপার্জনের পদ্ধতির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান সময়ে আধুনিক জীবনযাপন, দামি গ্যাজেট, বিলাসী ভ্রমণ কিংবা সামাজিক মাধ্যমে নিজের অবস্থান দেখানোর প্রবণতা অনেকের জীবনধারার অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে এসব শখ পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই অজান্তে ঋণ, সুদ ও অপচয়ের মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন।

বর্তমান নগদহীন অর্থনীতির যুগে মানুষের হাতে নগদ টাকার চেয়ে ক্রেডিট কার্ড, ডিজিটাল পেমেন্ট ও কিস্তির সুবিধা বেশি দেখা যায়। ‘এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন’ ধরনের সুবিধা অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচ করতে উৎসাহ দেয়। ফলে নিজের প্রকৃত সামর্থ্য না বুঝেই অনেকে দামি ফোন, বিলাসী খাবার, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা শখের পণ্যের জন্য ঋণের ওপর নির্ভর করেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে ঋণ নেওয়া নিজেই নিষিদ্ধ নয়। প্রয়োজনের সময় বৈধ কারণে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে শুধু সামাজিক মর্যাদা দেখানো, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য কিংবা বিলাসী জীবন ধরে রাখার জন্য ঋণ নেওয়া একজন মুসলিমের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে মিথ্যা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, সুদ এবং অপচয়ের মতো বিষয়।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঋণের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এসেছে, ঋণগ্রস্ত হলে মানুষ অনেক সময় কথা বলার ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। কারণ ঋণের চাপ মানুষের স্বাভাবিক আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিস্তি পরিশোধের চাপ, পরিবারের কাছে আর্থিক বিষয় গোপন করা কিংবা বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করার মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে চরিত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

হারাম লাইফস্টাইল-এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো সুদ। আধুনিক ঋণব্যবস্থার বড় একটি অংশ সুদের সঙ্গে যুক্ত। অনেক সময় ‘বিনা সুদের কিস্তি’ বা আকর্ষণীয় অফারের আড়ালেও বিলম্ব ফি কিংবা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিষয় থাকতে পারে। ইসলাম সুদকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যদি তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৮-২৭৯)

এছাড়া ইসলাম অপচয় থেকেও বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। অনেক সময় ঋণের মাধ্যমে কেনাকাটা করলে মানুষ খরচের প্রকৃত চাপ অনুভব করে না। হাতে টাকা না কমায় প্রয়োজনের বাইরে গিয়েও বিভিন্ন জিনিস কেনার প্রবণতা বাড়ে। দামি পোশাক, নতুন মডেলের ফোন কিংবা বিলাসী ভ্রমণ সাময়িক আনন্দ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, “আর যারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না, বরং তারা আছে এর মাঝামাঝি অবস্থানে।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)

এই আয়াত মুসলমানদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। ইসলাম মানুষকে সম্পদ উপভোগ করতে নিষেধ করেনি; বরং বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে বলেছে। তবে অহংকার, প্রদর্শন এবং সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় থেকে সতর্ক করেছে।

জীবনের প্রতিটি উপার্জন ও ব্যয়ের হিসাব একদিন দিতে হবে—এ কথাও ইসলাম মনে করিয়ে দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন মানুষকে তার সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে—কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে এবং কোন খাতে ব্যয় করেছে।

তাই আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার আগে নিজের সামর্থ্য, প্রয়োজন ও ইসলামের নির্দেশনা বিবেচনা করা জরুরি। প্রকৃত সফলতা দামি জিনিসের মালিক হওয়ায় নয়; বরং হালাল উপার্জন, পরিমিত ব্যয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যে রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, সুন্দর জীবন মানেই বিলাসী জীবন নয়। বরং যে জীবনে শান্তি, দায়িত্ববোধ, হালাল উপার্জন ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা রয়েছে—সেটিই প্রকৃত বরকতময় জীবন।

জনপ্রিয় সংবাদ

হারাম লাইফস্টাইল: শখের জীবন কি আপনাকে হারামের ঝুঁকিতে ফেলছে?

Update Time : ০৭:৪৪:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

হারাম লাইফস্টাইল শুধু কোনো খাবার বা কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনযাপন, অর্থ ব্যয় ও উপার্জনের পদ্ধতির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান সময়ে আধুনিক জীবনযাপন, দামি গ্যাজেট, বিলাসী ভ্রমণ কিংবা সামাজিক মাধ্যমে নিজের অবস্থান দেখানোর প্রবণতা অনেকের জীবনধারার অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে এসব শখ পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই অজান্তে ঋণ, সুদ ও অপচয়ের মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন।

বর্তমান নগদহীন অর্থনীতির যুগে মানুষের হাতে নগদ টাকার চেয়ে ক্রেডিট কার্ড, ডিজিটাল পেমেন্ট ও কিস্তির সুবিধা বেশি দেখা যায়। ‘এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন’ ধরনের সুবিধা অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচ করতে উৎসাহ দেয়। ফলে নিজের প্রকৃত সামর্থ্য না বুঝেই অনেকে দামি ফোন, বিলাসী খাবার, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা শখের পণ্যের জন্য ঋণের ওপর নির্ভর করেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে ঋণ নেওয়া নিজেই নিষিদ্ধ নয়। প্রয়োজনের সময় বৈধ কারণে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে শুধু সামাজিক মর্যাদা দেখানো, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য কিংবা বিলাসী জীবন ধরে রাখার জন্য ঋণ নেওয়া একজন মুসলিমের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে মিথ্যা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, সুদ এবং অপচয়ের মতো বিষয়।

আরও পড়ুন  ইসলামে উৎসাহিত খেলাধুলা: সুস্থতা, দক্ষতা ও আত্মরক্ষার শিক্ষা

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঋণের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এসেছে, ঋণগ্রস্ত হলে মানুষ অনেক সময় কথা বলার ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। কারণ ঋণের চাপ মানুষের স্বাভাবিক আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিস্তি পরিশোধের চাপ, পরিবারের কাছে আর্থিক বিষয় গোপন করা কিংবা বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করার মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে চরিত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

হারাম লাইফস্টাইল-এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো সুদ। আধুনিক ঋণব্যবস্থার বড় একটি অংশ সুদের সঙ্গে যুক্ত। অনেক সময় ‘বিনা সুদের কিস্তি’ বা আকর্ষণীয় অফারের আড়ালেও বিলম্ব ফি কিংবা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিষয় থাকতে পারে। ইসলাম সুদকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।

আরও পড়ুন  মুমিনের আত্মায় ঝরে তওবার বৃষ্টি

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যদি তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৮-২৭৯)

এছাড়া ইসলাম অপচয় থেকেও বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। অনেক সময় ঋণের মাধ্যমে কেনাকাটা করলে মানুষ খরচের প্রকৃত চাপ অনুভব করে না। হাতে টাকা না কমায় প্রয়োজনের বাইরে গিয়েও বিভিন্ন জিনিস কেনার প্রবণতা বাড়ে। দামি পোশাক, নতুন মডেলের ফোন কিংবা বিলাসী ভ্রমণ সাময়িক আনন্দ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, “আর যারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না, বরং তারা আছে এর মাঝামাঝি অবস্থানে।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)

আরও পড়ুন  যে তিন বিষয়ে মহানবী (সা.) শপথ করেছেন

এই আয়াত মুসলমানদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। ইসলাম মানুষকে সম্পদ উপভোগ করতে নিষেধ করেনি; বরং বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে বলেছে। তবে অহংকার, প্রদর্শন এবং সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় থেকে সতর্ক করেছে।

জীবনের প্রতিটি উপার্জন ও ব্যয়ের হিসাব একদিন দিতে হবে—এ কথাও ইসলাম মনে করিয়ে দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন মানুষকে তার সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে—কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে এবং কোন খাতে ব্যয় করেছে।

তাই আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার আগে নিজের সামর্থ্য, প্রয়োজন ও ইসলামের নির্দেশনা বিবেচনা করা জরুরি। প্রকৃত সফলতা দামি জিনিসের মালিক হওয়ায় নয়; বরং হালাল উপার্জন, পরিমিত ব্যয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যে রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, সুন্দর জীবন মানেই বিলাসী জীবন নয়। বরং যে জীবনে শান্তি, দায়িত্ববোধ, হালাল উপার্জন ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা রয়েছে—সেটিই প্রকৃত বরকতময় জীবন।