চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার গাজীপুর আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩০০ দরিদ্র, দুস্থ ও ছিন্নমূল মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণ। নিজেদের পকেট খরচ থেকে সাশ্রয় করা অর্থ দিয়ে তারা বিশেষ খাবারের আয়োজন করেন। শনিবার বেলা ১১টার দিকে রান্না করা খাবার আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দাদের মধ্যে পরিবেশন করা হয়।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের আয়োজন করে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফ্রেন্ডস জোন সোসাইটি। সংগঠনের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে আসছেন। এবার তারা ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন।
সংগঠন সূত্রে জানা যায়, এই আয়োজনের জন্য সদস্যরা কয়েক সপ্তাহ ধরে অর্থ সংগ্রহ করেন। কেউ টিফিনের টাকা থেকে, কেউ ব্যক্তিগত খরচ কমিয়ে, আবার কেউ বাড়তি খরচ বাদ দিয়ে অর্থ জমা করেন। সেই অর্থ দিয়েই আয়োজনের পুরো ব্যয় বহন করা হয়।
খাবারের মেনুতে ছিল গরুর মাংস, পোলাও, ভাত ও ডাল। প্রায় ৬০ কেজি গরুর মাংস দিয়ে রান্না করা হয় বিশেষ খাবার। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করে খাবার প্রস্তুত করা হয়।
রান্নার কাজ শুরু হয় খুব ভোর থেকে। সংগঠনের সদস্যরা নিজেরাই বাজার করা, রান্না এবং খাবার প্যাকেট তৈরির দায়িত্ব পালন করেন। পরে নির্ধারিত সময়ে সব খাবার গাজীপুর আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
খাবার পরিবেশনের সময় আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। দীর্ঘদিন পর পছন্দের খাবার পেয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার মুখেই দেখা যায় আনন্দের ছাপ। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ফ্রেন্ডস জোন সোসাইটির সভাপতি মো. ফয়সাল আহমেদ জানান, সংগঠনের অধিকাংশ সদস্যই শিক্ষার্থী। সীমিত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা সমাজের অসহায় মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছেন। সেই চিন্তা থেকেই এই আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়।
তিনি বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, অল্প অল্প করে সবাই এগিয়ে এলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, শুধু উৎসবের সময় নয়, সারা বছরই দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। সমাজের বিত্তবানদের পাশাপাশি তরুণদেরও মানবিক কাজে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। এতে সামাজিক বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়।
সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল খান বলেন, আমাদের সংগঠনের সদস্যরা আন্তরিকভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। কেউ শ্রম দিয়েছেন, কেউ অর্থ দিয়েছেন, আবার কেউ খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আয়োজন সফল হয়েছে।
এই কর্মসূচিতে অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আশিকুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তারা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করে খাবার বিতরণ করেন।
স্বেচ্ছাসেবীদের এমন উদ্যোগে খুশি হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তারা মনে করছেন, তরুণদের এই ধরনের কার্যক্রম সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। পাশাপাশি অন্যদেরও মানবিক কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, অনেক দিন ধরে ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়নি। দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট ও অভাবের কারণে অনেক সময় পেট ভরে খাবারও জোটে না। আজকের খাবার তাদের জন্য বিশেষ আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক দিন পর পেট ভরে ভালো খাবার খেয়ে খুব শান্তি লাগছে। যারা এই আয়োজন করেছে, তাদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করি। আল্লাহ যেন তাদের আরও ভালো কাজ করার তৌফিক দেন।
আশ্রয়কেন্দ্রের আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বিভিন্ন সময় অনেকেই সাহায্য নিয়ে এলেও এমনভাবে সবার জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন খুব কমই দেখা যায়। তরুণদের এই উদ্যোগ তাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে অনেক তরুণ সমাজসেবামূলক কাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। তবে ফ্রেন্ডস জোন সোসাইটির সদস্যরা ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম শুধু সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারই করে না, বরং তরুণদের মধ্যে নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার গুণও বৃদ্ধি করে। ফলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ সুগম হয়।
এ ধরনের উদ্যোগ সামাজিক বৈষম্য কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তখন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হয়।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। তরুণরা মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যাবে। মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত রাখতে এমন উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও স্বেচ্ছাসেবীদের এই কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সামাজিক উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
ফ্রেন্ডস জোন সোসাইটির সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা শুধু খাদ্য বিতরণ নয়, শিক্ষা সহায়তা, শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করছেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার তাদের।
তরুণদের এই মানবিক উদ্যোগ প্রমাণ করে, বড় পরিবর্তন আনতে সব সময় বড় অর্থের প্রয়োজন হয় না। আন্তরিকতা, সহমর্মিতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই পারে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। চাঁদপুরের এই তরুণরা সেই উদাহরণই আবারও সামনে তুলে ধরেছেন।





























