ডায়াবেটিসের নতুন ট্রিপল-অ্যাকশন টিকা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের ইঙ্গিত দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে মাত্র একবার নেওয়া রেটাট্রুটাইড নামের এই ইনজেকশন রক্তে শর্করার মাত্রা কমানোর পাশাপাশি শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতেও অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস ও স্থূলতা বর্তমানে অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। কোটি কোটি মানুষ এই দুই জটিল স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এমন একটি ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি খুঁজছিলেন, যা একই সঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং ওজন হ্রাসে কার্যকর হবে। রেটাট্রুটাইড সেই প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করেছে। সম্প্রতি চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল নতুন আশার বার্তা দিয়েছে। গবেষণায় অংশ নেন ৯৩০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, যারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউই আগে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের কোনো ওষুধ গ্রহণ করেননি।
একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল এবং সবার শরীরের ভর সূচক নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল। গবেষণার অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়। একদলকে ৪ মিলিগ্রাম, আরেক দলকে ৯ মিলিগ্রাম এবং তৃতীয় দলকে ১২ মিলিগ্রাম রেটাট্রুটাইড দেওয়া হয়। অন্যদিকে একটি দলকে পরীক্ষামূলক তুলনার জন্য নিষ্ক্রিয় ওষুধ দেওয়া হয়। টানা ৪০ সপ্তাহ ধরে তাদের শারীরিক অবস্থার বিভিন্ন সূচক পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এই পর্যবেক্ষণের আওতায় রক্তে শর্করার গড় মাত্রা, শরীরের ওজন, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সূচক নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণার ফলাফল চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ইতিবাচক ছিল। ফলাফলে দেখা যায়, রেটাট্রুটাইড গ্রহণকারীদের রক্তে শর্করার দীর্ঘমেয়াদি সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গড় হিসাবে এই সূচক ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে নিষ্ক্রিয় ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এই উন্নতির পরিমাণ ছিল অনেক কম।
শুধু রক্তে শর্করার মাত্রাই নয়, শরীরের ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও এই ওষুধ বিস্ময়কর ফল দেখিয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওজন গড়ে ১১ দশমিক ৫ থেকে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় ওষুধ গ্রহণকারী দলের ওজন কমেছে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, রেটাট্রুটাইডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি একসঙ্গে তিন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অন্ত্র-হরমোনের কার্যকারিতা অনুকরণ করে। এই কারণেই একে ট্রিপল-অ্যাকশন বা তিনমুখী কার্যকারিতাসম্পন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি বলা হচ্ছে।
বর্তমানে ডায়াবেটিস ও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অনেক জনপ্রিয় ওষুধ মূলত একটি বা দুটি হরমোনের কার্যকারিতা অনুসরণ করে। কিন্তু রেটাট্রুটাইড একযোগে জিএলপি-১, জিআইপি এবং গ্লুকাগন নামের তিনটি হরমোনের ওপর কাজ করে। এর ফলে শরীরে একাধিক ইতিবাচক পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটতে পারে। জিএলপি-১ হরমোন ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জিআইপি ইনসুলিন নিঃসরণকে আরও কার্যকর করে তোলে। অন্যদিকে গ্লুকাগন শরীরের শক্তি ব্যয় বাড়াতে সহায়তা করে। এই তিনটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে সক্রিয় হওয়ার কারণে রোগীরা দ্রুত ওজন কমাতে সক্ষম হন।
গবেষকদের মতে, গ্লুকাগন রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়াই এই ওষুধের অন্যতম বিশেষ সুবিধা। কারণ এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়িয়ে অতিরিক্ত ক্যালোরি ব্যয় করতে সহায়তা করে। ফলে শুধুমাত্র খাদ্য গ্রহণ কমে না, বরং শরীরের শক্তি ব্যবহারের হারও বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং রক্তচাপেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও এই উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ডায়াবেটিস ও স্থূলতার সঙ্গে হৃদ্রোগের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
তবে যেকোনো ওষুধের মতো রেটাট্রুটাইডেরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। গবেষণায় মোট ১৪ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যদিও তাদের মধ্যে দুজন নিষ্ক্রিয় ওষুধ গ্রহণকারী দলের সদস্য ছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার। বিশেষ করে পরিপাকতন্ত্র-সংক্রান্ত সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ উপসর্গ কমে গেছে এবং অংশগ্রহণকারীরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যেসব রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বর্তমান চিকিৎসা পর্যাপ্ত ফল দিচ্ছে না, তাদের জন্য এই ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে স্থূলতায় ভোগা মানুষের জন্যও এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। স্থূলতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাথ ম্যাককালো বলেছেন, ডায়াবেটিস ও স্থূলতায় আক্রান্ত বহু মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে এই ধরনের চিকিৎসা। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে কোনো ওষুধকে জাদুকরী সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্যদিকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডা. মেরি স্প্রেকলি মনে করেন, গবেষণায় দেখা ওজন হ্রাসের মাত্রা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমান সময়ে ব্যবহৃত অন্যান্য জনপ্রিয় ওষুধের সঙ্গে সরাসরি তুলনামূলক গবেষণা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, শুধু ওজন কমানোই একজন মানুষের সুস্বাস্থ্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। ওজন কমানোর পাশাপাশি পেশিশক্তি সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর গবেষকরাও এই ফলাফলকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নতুন এই শ্রেণির ওষুধ ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগী একই সঙ্গে ডায়াবেটিস এবং স্থূলতায় ভুগছেন, তারা দ্বৈত সুবিধা পেতে পারেন। বর্তমানে রেটাট্রুটাইড নিয়ে আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল গবেষণা চলমান রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় এর অবস্থান নির্ধারণে এসব গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সব মিলিয়ে ডায়াবেটিসের নতুন ট্রিপল-অ্যাকশন টিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এক সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এখনই এটিকে চূড়ান্ত সমাধান বলা যাবে না, তবুও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, ওজন হ্রাস এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




























