বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজের মনের কথা অকপটে জানিয়েছেন ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সফল এই কোচ স্বীকার করেছেন, বড় ম্যাচের আগে এখনও তাঁর মনে ভয়ের অনুভূতি কাজ করে। তবে তাঁর মতে, এই ভয় দুর্বলতার নয়, বরং সতর্ক থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
আগামী শনিবার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে মাঠে নামবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট সমীহ করার বার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, মরক্কোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে মরক্কো যে ইতিহাস গড়েছিল, সেটিও স্মরণ করিয়ে দেন ব্রাজিল কোচ। সেই আসরে স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল আফ্রিকার দেশটি। ফলে বর্তমান মরক্কো দলকে নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন তিনি।
নিজের অনুভূতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আনচেলত্তি একটি উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবনে ভয় একটি স্বাভাবিক বিষয়। অনেক সময় ভয় না থাকলে বিপদের গুরুত্ব বোঝা যায় না এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আনচেলত্তির ভাষায়, সামনে যদি একটি সিংহ দাঁড়িয়ে থাকে আর কেউ যদি ভয় না পায়, তাহলে সে সিংহকে বিড়াল ভেবে ভুল করতে পারে। ঠিক তেমনি ফুটবল মাঠেও প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়ন করলে তার মূল্য দিতে হয়। তাই ভয়কে তিনি বাস্তবতা বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন।
ব্রাজিল কোচ মনে করেন, একজন কোচের সবসময় সচেতন থাকা জরুরি। কারণ দলের মনোযোগ ধরে রাখা এবং খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা কোচিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো ধরনের আত্মতুষ্টি বড় টুর্নামেন্টে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
তবে সতর্কতার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসেরও কোনো ঘাটতি নেই আনচেলত্তির কণ্ঠে। তিনি জানিয়েছেন, ব্রাজিল দল বিশ্বকাপের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে এবং সমর্থকদের ভালো ফুটবল উপহার দিতে মুখিয়ে আছে তাঁর দল।
শান্ত স্বভাবের এই ইতালিয়ান কোচ বলেন, তিনি স্বভাবগতভাবেই আশাবাদী মানুষ। তাই মরক্কোর শক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকলেও তিনি বিশ্বাস করেন, সেলেসাওরা নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইতিবাচক ফল নিয়েই মাঠ ছাড়বে।
আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে মরক্কোর উত্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন আনচেলত্তি। তাঁর মতে, আধুনিক ফুটবলে এখন আর ছোট দল বলে কিছু নেই। আন্তর্জাতিক ফুটবলের মান এতটাই বেড়েছে যে যে কোনো দল বড় প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
বিশেষ করে মরক্কোর বর্তমান স্কোয়াডে রয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাবে খেলা অভিজ্ঞ ফুটবলার। অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির নেতৃত্বে দলটি গত কয়েক বছরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে ম্যাচটি মোটেও সহজ হবে না বলে মনে করছেন ব্রাজিল কোচ।
মরক্কোর বিপক্ষে সাফল্য পেতে হলে আক্রমণ, রক্ষণ এবং মাঝমাঠ—সব বিভাগেই সেরা পারফরম্যান্স দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দক্ষতা নয়, দলগত সমন্বয়ই এই ম্যাচে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
ক্লাব ফুটবলে কার্লো আনচেলত্তির অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগেই শিরোপা জয়ের বিরল রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। এছাড়া কোচ হিসেবে সর্বোচ্চ পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের কৃতিত্বও তাঁর দখলে।
খেলোয়াড় জীবনেও তিনি ছিলেন সফল। ইতালির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এসি মিলানের হয়ে দুটি ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছিলেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বহু বড় ম্যাচ ও বড় মঞ্চ দেখলেও জাতীয় দলের বিশ্বকাপ মিশন তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।
ব্রাজিলের মতো বিশ্বের সবচেয়ে সফল জাতীয় দলের দায়িত্ব পাওয়াকে তিনি সৌভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটিকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বলেও উল্লেখ করেছেন।
আনচেলত্তি বলেন, ফুটবলের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করা যে কোনো কোচের জন্য বিরাট সম্মানের বিষয়। ব্রাজিলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সমর্থকদের প্রত্যাশা তাঁকে অনুপ্রাণিত করছে।
বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে ব্রাজিল এবার নতুন উদ্দীপনা নিয়ে মাঠে নামছে। দীর্ঘদিন ধরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপার অপেক্ষায় থাকা দেশটির সমর্থকরা আশাবাদী, আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা এবং কৌশল দলকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তবে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে কোনো কিছুই সহজ নয়। প্রতিটি ম্যাচই নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। তাই মরক্কোর বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ থেকেই সতর্ক ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্রাজিলের এই অভিজ্ঞ কোচ।
বিশ্বকাপের চাপকে উপভোগ করার কথাও জানিয়েছেন আনচেলত্তি। তাঁর মতে, ক্যারিয়ারের এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি এই মুহূর্তকে আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করতে চান।
সবশেষে ব্রাজিল কোচ আশা প্রকাশ করেন, দলের সাফল্যে তিনি নিজের সর্বোচ্চ অবদান রাখতে পারবেন। তাঁর বিশ্বাস, সঠিক প্রস্তুতি, মনোযোগ এবং দলগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ব্রাজিল আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হবে।
























