বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য নাঈম হাসানকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে একদল ব্যক্তি তাঁকে আটক, হেনস্তা এবং জোরপূর্বক একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এ প্রতিক্রিয়া জানান। তারা বলেন, একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন আচরণ শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি অশনিসংকেত।
বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় উল্লেখ করেন, নাঈম হাসানকে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক করার চেষ্টা করা হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত গাড়ির পরিবর্তে একটি সাধারণ ব্যক্তিগত গাড়িতে তোলার চেষ্টা চালানো হয়। এমন পরিস্থিতি জনমনে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এবি পার্টির নেতারা বলেন, নাঈম হাসানের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি নিজের পরিচয় এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি। বরং তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং ঘটনাটি কাউকে না জানানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাদের মতে, ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নাঈম হাসান নিজেই আশঙ্কা করেছিলেন যে তাঁকে গুম করা হতে পারে। একজন পরিচিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার যদি প্রকাশ্যে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতে বাধ্য হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঘটনা শুধু একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; বরং এটি নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। কোনো নাগরিককে আইনগত ভিত্তি ছাড়া আটক বা হয়রানির অভিযোগ দেশের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
এবি পার্টির নেতারা আরও বলেন, রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা কিংবা কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইন প্রয়োগের নামে কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করা বা অপহরণসদৃশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা অপরিহার্য। তারা উল্লেখ করেন, অতীতে গুম ও বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আলোচনা ছিল, এ ধরনের ঘটনা সেই স্মৃতিকে আবারও সামনে নিয়ে আসে। ফলে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
এবি পার্টি ঘটনার অবিলম্বে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, যারা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে অথবা কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার নাম ব্যবহার করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে এবং আইনের আওতায় আনতে হবে। দলটি আরও বলেছে, এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশেরও দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার পর তিনজন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এবি পার্টি। তাদের মতে, দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যে-ই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নেতৃদ্বয় বলেন, দেশের কোনো নাগরিক যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের হয়রানি, অপহরণসদৃশ আচরণ বা নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি না হন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
তারা আরও বলেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। একজন নাগরিক নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে তা কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। এবি পার্টি তাদের বিবৃতির শেষাংশে একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে যেখানে কোনো মানুষকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে না এবং কাউকে আর গুম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে জীবনযাপন করতে হবে না।
চট্টগ্রামে নাঈম হাসানকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা এখন জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



























