রাজনৈতিক ঐক্যই স্থিতিশীল বাংলাদেশের ভিত্তিএকটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে— ‘কিছু না পাওয়ার চেয়ে, পেয়ে হারানোর বেদনা অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড, বক্তব্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা পর্যালোচনা করলে যে কেউ সহজে বুঝতে পারবেন তারা ঠিক কোন ধরনের মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন।এই অসুখের গভীরতা ও ক্ষমতার প্রতি উদগ্র লোভের স্বরূপ উন্মোচন করতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।
দীর্ঘ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের পর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছেন। জাতিসংঘের নিরপেক্ষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষকে পঙ্গু করেও স্বৈরাচার তার মসনদ রক্ষা করতে পারেনি। সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলনের তীব্র তরঙ্গে তাসের ঘরের মতো ভেসে গিয়েছিল সেই প্রতাপশালী শাসনব্যবস্থা।পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে জামায়াত এবং এনসিপি কার্যত এক রাজকীয় জীবন উপভোগ করেছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ থেকে শুরু করে প্রশাসনে পদায়ন, বদলি, তদবির, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি— সর্বত্রই ছিল তাদের আধিপত্য।
বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মীদের দাপট ছিল অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া। ৫ আগস্টের আগে যেসব নেতার নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা ছিল, তারা রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ জীবনযাপন ছেড়ে বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ি ও অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন তারা। অভ্যুত্থানের পর উপদেষ্টা পদে বসে বিপুল অর্থবিত্ত গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কারও কারও বিরুদ্ধে।
একচ্ছত্র ক্ষমতার এই অভিজ্ঞতা থেকে তাদের মনে ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয়। অভ্যুত্থানের পুরো কৃতিত্ব নিজেদের বলে দাবি করে তারা ধরে নিয়েছিলেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা না করেই তাদের মাথায় ক্ষমতার মুকুট পরিয়ে দেবে। কিন্তু যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং ব্যালটের স্পষ্ট জনরায়ে তারা প্রত্যাখ্যাত হলেন, তখন থেকে তাদের আচরণে দেখা দিয়েছে চরম উন্মাদনা।দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার মধু থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা নিজেদের ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। ক্ষমতার মোহ তাদের এতটাই অন্ধ করেছে যে, জনগণের বিপুল রায়ে গঠিত একটি বৈধ ও গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে তারা নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপ্রাসঙ্গিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন।
আজকের বাংলাদেশ যে সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, তার প্রধান তারেক রহমান জনগণের বিপুল রায়ে নির্বাচিত হয়ে দেশ পুনর্গঠনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বিলাসী জীবন ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করছেন, সরকারি খরচ সীমিত করেছেন এবং জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন।ক্ষমতার চূড়ায় বসেও তিনি কোনো ধরনের অহংকার না দেখিয়ে জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের বাসায় নিজে গিয়েছেন, তাদের সঙ্গে মিলেমিশে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারপ্রধান হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের নিয়ে কোনো কটু কথা বলেননি। তিনি রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করতে চাচ্ছেন।
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত ও এনসিপির যদি ন্যূনতম সুস্থ বোধ ও শিষ্টাচার থাকত, তবে তারা তারেক রহমানের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সাধুবাদ জানাত। তারা সরকারের জামায়াত সে পথ বেছে নেয়নি।ক্ষমতার লোভ তাদের এতটাই আচ্ছন্ন করেছে যে, তারা পতিত ফ্যাসিবাদ ফিরে এলে নিজেদের কী পরিণতি হবে, সেটিও অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এখানে একটি তিতা সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। ৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার চরম গুণগত পরিবর্তন আশা করেছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে জামায়াত ও এনসিপির অনেক নেতার অনিয়ম, বৈষম্য, দুর্নীতি, এবং বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে হতাশ করেছে।ফলে পতিত হাসিনার আমলের অপকর্মের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ডের তুলনা শুরু করেছিল দেশের সাধারণ জনগণ। এনসিপি ও জামায়াত নেতাদের অনিয়ম ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণে মানুষ এতটাই বিরক্ত হয়েছিল যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা আওয়ামী লীগের আমলকে তুলনামূলক বিশ্লেষণে টেনে আনতেও বাধ্য হয়েছিল।
একটি গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের মনে এমন ধারণার সৃষ্টি হওয়া ছিল চরম দুর্ভাগ্যজনক।
আরো দুর্ভাগ্যজনক হল, গণতান্ত্রিক রায় মেনে নেওয়ার মানসিকতা এনসিপি ও জামায়াত দেখাতে পারেনি। বরং তারা প্রতিদিন অনভিপ্রেত ও অশালীন ভাষায় সরকারকে হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে, যা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা হতে পারে না।




























