বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল আবারও নতুন এক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হওয়ার আগে আলোচনায় রয়েছে সেলেসাওদের একটি অনন্য রেকর্ড। গত ৮৮ বছরে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে কখনো হারেনি ব্রাজিল।
ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে ব্রাজিলের সাফল্যের গল্প শুধু পাঁচটি শিরোপা জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দেশ হিসেবে তারা ধারাবাহিকতারও এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। আর সেই ধারাবাহিকতার অন্যতম অংশ উদ্বোধনী ম্যাচের সাফল্য।
তবে শুরুটা এতটা সুখকর ছিল না। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে ব্রাজিল নিজেদের প্রথম ম্যাচে যুগোস্লাভিয়ার কাছে পরাজিত হয়েছিল। সে সময় দল গঠনে অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সমস্যার প্রভাবও স্পষ্ট ছিল।
চার বছর পর ১৯৩৪ বিশ্বকাপে আবারও প্রথম ম্যাচে হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় ব্রাজিলের। নকআউট পদ্ধতির সেই আসরে স্পেনের বিপক্ষে ৩-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। সেটিই ছিল ওই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের একমাত্র ম্যাচ।
মজার বিষয় হলো, ১৯৩৪ সালের সেই পরাজয়ের পর আর কখনো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হারেনি সেলেসাওরা। এরপর থেকে টানা ২০টি বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তারা ১৭টি ম্যাচ জিতেছে এবং তিনটি ম্যাচ ড্র করেছে।
ব্রাজিলের এই রেকর্ড শুধু দীর্ঘ নয়, অত্যন্ত প্রভাবশালীও। প্রায় এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে খেলে এমন ধারাবাহিকতা ধরে রাখা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিরল কীর্তি। এ কারণেই রেকর্ডটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের তিনটি ড্রয়ের মধ্যে প্রথমটি আসে ১৯৭৪ সালে। সে আসরে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে তারা। এরপর ১৯৭৮ বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষে ১-১ গোলে সমতা নিয়ে মাঠ ছাড়ে সেলেসাওরা।
সবশেষ উদ্বোধনী ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর ঘটনা ঘটে ২০১৮ বিশ্বকাপে। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই আসরে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেছিল ব্রাজিল। তবে ড্র হলেও অপরাজিত থাকার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন ছিল।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচগুলোতে ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবলেরও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০টি উদ্বোধনী ম্যাচে তারা মোট ৪৯টি গোল করেছে। প্রতি ম্যাচে দুই গোলেরও বেশি গড় তাদের আক্রমণভিত্তিক ফুটবল দর্শনের প্রতিফলন।
এই পরিসংখ্যান আরও বেশি চমকপ্রদ হয়ে ওঠে মেক্সিকোর বিপক্ষে রেকর্ড দেখলে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোকে তিনবার হারিয়েছে ব্রাজিল। অন্য কোনো দলের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে এত বেশি জয় নেই তাদের।
শুধু জয়ই নয়, মেক্সিকোর বিপক্ষে ওই তিন ম্যাচে ব্রাজিল করেছে ১১ গোল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেই ম্যাচগুলোতে একবারও নিজেদের জালে বল ঢুকতে দেয়নি সেলেসাওরা। ফলে প্রথম ম্যাচে তাদের আধিপত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এবারের বিশ্বকাপেও সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে ব্রাজিল। গ্রুপ ‘সি’-এর প্রথম ম্যাচে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো। ম্যাচটি নিয়ে ইতোমধ্যে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে মরক্কোকে কোনোভাবেই সহজ প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই। ২০২২ বিশ্বকাপে আফ্রিকার ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিল দলটি। সেই সাফল্যের পর তারা নিজেদের বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী দলগুলোর কাতারে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মরক্কোর বর্তমান স্কোয়াডেও রয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ লিগে খেলা একাধিক তারকা ফুটবলার। সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ ফুটবল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ফলে ব্রাজিলের জন্য ম্যাচটি মোটেও সহজ হবে না।
দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসও বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখন পর্যন্ত ব্রাজিল ও মরক্কো একে অপরের বিপক্ষে একটি করে জয় পেয়েছে। ফলে পরিসংখ্যানের দিক থেকেও কোনো দলকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল মরক্কোকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মরক্কোর ফুটবল অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। আফ্রিকান দলটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের প্রীতি ম্যাচে সেই উন্নতির প্রমাণও দিয়েছে মরক্কো। তারা ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলকে নতুন বার্তা দিয়েছিল। সেই ফলাফল এবারও তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে রাখবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে রয়েছে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে ৮৮ বছরের ঐতিহাসিক অপরাজিত রেকর্ড ধরে রাখার লক্ষ্য, অন্যদিকে শক্তিশালী মরক্কোর বাধা অতিক্রম করার পরীক্ষা। তাই ম্যাচটি শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং ইতিহাস রক্ষার মঞ্চও হতে যাচ্ছে ব্রাজিলের জন্য।























