তৃণমূলের সংকট বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বড় ধরণের হুমকির মুখে পড়েছে। দলের একসময়ের ঘনিষ্ঠ নেতা-নেত্রীরাই এখন মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন এবং বড় ধরণের ভাঙনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। বিদ্রোহী শিবিরটি এখন দাবি করছে যে, তাদের সাথে থাকা সংসদ সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা দলটিকে সাংগঠনিকভাবে ভেঙে দিতে সক্ষম। তৃণমূলের সংকট নিরসনে মমতার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত এই বিশাল ভাঙন আটকাতে পারছে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আজ রোববার ১৪ জুন কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে এই চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক নাটকীয়তার নতুন তথ্য প্রকাশ্যে আসে। বিদ্রোহী শিবিরের প্রধান নেতা এমপি কাকলি ঘোষ দস্তিদার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই সংকটের বর্তমান রূপরেখা তুলে ধরেন। মমতা ব্যানার্জির অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী এখন প্রকাশ্যেই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা তৃণমূলের ভেতরকার অস্থিরতাকে সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে। মূলত গত মাসে নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর থেকেই এই ক্ষোভের আগুন তীব্রভাবে জ্বলতে শুরু করেছে।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছেন যে, বর্তমানে তাদের বিদ্রোহী শিবিরে সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২০ থেকে বেড়ে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। তিনি দাবি করেছেন যে আরও বেশ কয়েকজন এমপি তাদের সাথে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন এবং তাদের মূল লক্ষ্য হলো একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটানো। বিদ্রোহীদের এই ব্লকটি ইতিমধ্যেই লোকসভার স্পিকারের কাছে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আগামীকাল স্পিকারের সাথে এই বিদ্রোহী দলের একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের কথা রয়েছে, যেখানে অনেক গোপন বিষয় চূড়ান্ত হতে পারে।
বিদ্রোহী নেত্রী আরও যোগ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ ছিলেন, তাদের সবার মতামতকে এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কাকলি ঘোষ স্পষ্ট করে বলেছেন যে, “এখানে সবার মতামত শোনা হবে, কোনো একনায়কতন্ত্র চলবে না,” যা সরাসরি মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক শৈলীকে ইঙ্গিত করে। তৃণমূলের সংকট আরও স্পষ্ট হয় যখন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ নেতার বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে গোপন বৈঠকের খবরটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, খুব শীঘ্রই এই বড় একটি গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে দল ত্যাগের ঘোষণা দিতে পারে।
অতিরিক্ত তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির বিজেপি এমপি ভূপেন্দর যাদবের বাসভবনে শতাব্দী রায়, মালা রায় এবং সায়নী ঘোষের মতো প্রভাবশালী এমপিদের দেখা গেছে। এছাড়া প্রবীণ নেতা মানস ভূঁইয়া ইতিমধ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, যা মমতার জন্য আরেকটি ব্যক্তিগত ধাক্কা। তৃণমূলের সংকট কেবল এমপিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; পশ্চিমবঙ্গের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৬০ জনই এখন বিদ্রোহী শিবিরে অবস্থান নিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তারা সম্মিলিতভাবে দলীয় হাইকমান্ডের কোনো সিদ্ধান্ত মানতে আর রাজি নন।
বর্তমানে মমতা ব্যানার্জি তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন যেখানে তার দলের অভ্যন্তরেই তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্তর্ভুক্তি এই বিদ্রোহী শিবিরকে আরও বেশি শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামীকালের স্পিকারের বৈঠকটিই ঠিক করে দেবে যে তৃণমূল কংগ্রেস আসলে কতটা অক্ষত থাকবে নাকি বড় কোনো ভাঙন অবশ্যম্ভাবী। তৃণমূলের সংকট কাটাতে মমতা ব্যানার্জি কোনো জাদুকরী পদক্ষেপ নিতে পারেন কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।




























