পোভেগ্লিয়া রহস্য শুরু হয় ইতালির ভেনিসের কাছাকাছি ছোট্ট একটি দ্বীপকে ঘিরে। চারদিকে নীল পানি, দূরে ভেনিসের বিখ্যাত শহর, আর মাঝখানে সবুজে ঢাকা এক নির্জন দ্বীপ। বাইরে থেকে জায়গাটি যতটা শান্ত, এর অতীত ততটাই অন্ধকার। শত শত বছর ধরে প্লেগ, কোয়ারেন্টাইন, মৃত্যু এবং পরিত্যক্ত হাসপাতালের ইতিহাস এই দ্বীপকে ঘিরে তৈরি করেছে ভয়ংকর এক কিংবদন্তি। আজও দ্বীপটি সাধারণ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভয়ংকর গল্পের পেছনে কিছু বাস্তব ইতিহাস যেমন আছে, তেমনি আছে এমন অনেক দাবি, যার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ভেনিসের লেগুনে অবস্থিত পোভেগ্লিয়া আয়তনে খুব বড় কোনো দ্বীপ নয়। কিন্তু ভেনিসের ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক বহু পুরোনো। প্লেগের মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়লে মানুষকে মূল শহর থেকে আলাদা রাখার জন্য ভেনিসের বিভিন্ন দ্বীপকে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ইতিহাসে ভেনিসের Lazzaretto Vecchio এবং Lazzaretto Nuovo-এর মতো দ্বীপের নথিভুক্ত ভূমিকার কথাও পাওয়া যায়।
পোভেগ্লিয়ার অন্ধকার অধ্যায় আরও স্পষ্ট হয় ১৭৯৩ সালের দিকে। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, দ্বীপটি প্লেগ কোয়ারেন্টাইন স্টেশন বা ‘লাজারেত্তো’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং ১৮১৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যবহার চলেছিল। রোগে আক্রান্ত বা রোগের আশঙ্কা থাকা মানুষকে বিচ্ছিন্ন রাখার উদ্দেশ্যেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তখনকার সময়ে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল না। ফলে সংক্রামক রোগের ভয় ছিল ভয়াবহ।
ভাবুন, কয়েক শত বছর আগে একটি ছোট দ্বীপে আপনাকে নিয়ে যাওয়া হলো। চারদিকে পানি। মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন। আপনি জানেন, সেখানে যাওয়া মানে পরিবার ও পরিচিত জীবন থেকে দূরে থাকা। অসুস্থ মানুষের জন্য সেই বিচ্ছিন্নতা নিশ্চয়ই আরও কঠিন ছিল। এই বাস্তব ইতিহাসই পরবর্তী সময়ে পোভেগ্লিয়াকে ঘিরে ভয়ংকর গল্প তৈরির অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
তবে পোভেগ্লিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত দাবিগুলোর অনেকটাই কিংবদন্তি। প্রচলিত গল্পে বলা হয়, দ্বীপে বিপুলসংখ্যক প্লেগ আক্রান্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং তাদের দেহ সেখানে সমাহিত করা হয়েছিল। এমনকি দ্বীপের মাটির বড় একটি অংশ মানুষের দেহাবশেষে পরিণত হয়েছে বলেও নানা জায়গায় দাবি করা হয়। কিন্তু এই নির্দিষ্ট দাবিগুলোর পক্ষে শক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। কাছাকাছি ভেনিসের প্লেগ দ্বীপগুলোতে হাজারো মৃতের গণকবরের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, কিন্তু সেটিকে সরাসরি পোভেগ্লিয়ার প্রতিটি প্রচলিত গল্পের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
এরপর আসে আরও একটি অন্ধকার অধ্যায়। ১৯২২ সালে পোভেগ্লিয়ায় একটি মানসিক হাসপাতাল চালু হয়। হাসপাতালটি ১৯৬৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়। আজও দ্বীপের পরিত্যক্ত ভবনগুলোকে ঘিরে সেই সময়ের স্মৃতি টিকে আছে।
এই হাসপাতালকে ঘিরেই জন্ম নেয় সবচেয়ে ভয়ংকর কিংবদন্তিগুলোর একটি। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, সেখানে এক চিকিৎসক রোগীদের ওপর ভয়ংকর পরীক্ষা চালাতেন এবং অনেক রোগীকে নির্যাতন করতেন। আরও বলা হয়, সেই চিকিৎসক পরে হাসপাতালের ঘণ্টা টাওয়ার থেকে পড়ে মারা যান। কিন্তু এই গল্পের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ খুবই দুর্বল। তাই এটিকে বাস্তব ঘটনা না বলে প্রচলিত কিংবদন্তি হিসেবেই দেখা উচিত।
পোভেগ্লিয়া রহস্যের জনপ্রিয়তা মূলত এখান থেকেই আরও বেড়ে যায়। পরিত্যক্ত হাসপাতাল, পুরোনো ভবন, রোগ ও মৃত্যুর ইতিহাস এবং দ্বীপটির নির্জন পরিবেশ একসঙ্গে মানুষের কল্পনাকে নাড়া দেয়। পরে বিভিন্ন ভূত শিকারি ও paranormal investigator দ্বীপটির সঙ্গে অতিপ্রাকৃত ঘটনার গল্প যুক্ত করেন। কেউ কেউ দাবি করেন, সেখানে মানুষের কান্না শোনা যায়, অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভূত হয় কিংবা পুরোনো ভবনের ভেতর অস্বাভাবিক কিছু দেখা যায়। তবে এসব দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বাস্তবতার দিক থেকে দেখলে, পোভেগ্লিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হয়তো ভূত নয়, বরং এর ইতিহাস। কয়েক শত বছর আগে মহামারি মানুষের জীবনকে কীভাবে বদলে দিয়েছিল, তার একটি স্মৃতি বহন করে এই ছোট্ট দ্বীপ। রোগ প্রতিরোধের জন্য কোয়ারেন্টাইন ছিল প্রয়োজনীয় একটি ব্যবস্থা। কিন্তু সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিচ্ছিন্নতা, মৃত্যু ও ভয় মানুষের মনে গভীর ছাপ রেখে যায়।
আজ পোভেগ্লিয়া সাধারণ পর্যটনস্থল নয় এবং দ্বীপটি জনসাধারণের জন্য বন্ধ থাকার তথ্যও পাওয়া যায়। ধ্বংসপ্রায় ভবনগুলো ধীরে ধীরে গাছপালায় ঢেকে যাচ্ছে। দূর থেকে দেখলে জায়গাটি যেন ভেনিসের সুন্দর লেগুনের মাঝখানে একটি নীরব রহস্য। ভেনিসের সরকারি তথ্যভান্ডারেও পোভেগ্লিয়াকে ঐতিহাসিকভাবে ভেনিসের বিভিন্ন দ্বীপের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে কি পোভেগ্লিয়া সত্যিই অভিশপ্ত? ইতিহাসের হাতে এর কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। দ্বীপটিতে ভূতের অস্তিত্বের প্রমাণও পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্লেগ কোয়ারেন্টাইন স্টেশন এবং পরবর্তী মানসিক হাসপাতালের ইতিহাস সত্য। আর সেই বাস্তব অতীতের ওপর ভর করেই তৈরি হয়েছে ভয়ংকর সব গল্প।
সম্ভবত এ কারণেই পোভেগ্লিয়া রহস্য এত বছর পরও মানুষের কৌতূহল ধরে রেখেছে। ভেনিসের ঝলমলে সৌন্দর্য থেকে খুব বেশি দূরে নয়, অথচ সেই সৌন্দর্যের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে একটি নির্জন দ্বীপ, যার ইতিহাসে আছে রোগ, বিচ্ছিন্নতা, মৃত্যু এবং অসংখ্য প্রশ্ন। সত্য আর কিংবদন্তির সীমারেখা যেখানে অস্পষ্ট, পোভেগ্লিয়ার ভয়টা ঠিক সেখানেই।
এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রহস্যকে রহস্য হিসেবেই দেখা। কোনো ভয়ংকর দাবি শুনলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া নয়। পোভেগ্লিয়ার ক্ষেত্রে নথিভুক্ত ইতিহাস এবং লোককথা আলাদা করে দেখলেই বোঝা যায়, বাস্তব ঘটনাই কখনো কখনো কল্পকাহিনির চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর হতে পারে।



























