ঢাকা ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম চলবে : ‎ডা. তাহের

মাদক ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে বক্তব্য রাখছেন ডা. তাহের। ছবি: সংগৃহীত

মাদকবিরোধী সংগ্রাম চলমান থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ডা. তাহের। তিনি বলেছেন, সমাজকে মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে হবে না, বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সম্প্রতি আয়োজিত এক সচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. তাহের এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে দেশের অন্যতম বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি।

ডা. তাহের বলেন, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই তরুণদের একটি অংশ মাদকাসক্তি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রও। তিনি বলেন, মাদক একজন মানুষের চিন্তাশক্তি, বিবেক, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারও বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেক কিশোর অল্প বয়সেই ভুল বন্ধুত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং পারিবারিক নজরদারির অভাবে অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। প্রথমে তারা ছোটখাটো দুষ্টুমি বা দলবদ্ধ ঘোরাফেরার মাধ্যমে শুরু করলেও একসময় মারামারি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই এবং অন্যান্য অপরাধে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

ডা. তাহেরের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে বেশ কিছু সামাজিক কারণ রয়েছে। পরিবারে সময়ের অভাব, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এর অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে অনেক অভিভাবক জীবিকার প্রয়োজনে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সময় দেওয়ার সুযোগ পান না। ফলে সন্তানরা মানসিকভাবে একাকিত্ব অনুভব করে এবং ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

তিনি বলেন, একটি শিশুর প্রথম শিক্ষালয় হলো পরিবার। পরিবার থেকেই একজন শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখে। তাই সন্তানকে শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক আচরণ গঠনের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত—এসব বিষয়ে পরিবারের নজরদারি থাকতে হবে।

মাদকবিরোধী সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ডা. তাহের। তিনি বলেন, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞানচর্চা এবং সৃজনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের ইতিবাচক পথে পরিচালিত করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা উচিত।

তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ করে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে, ফলাফলে অবনতি ঘটলে কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করলে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। অনেক সময় এসব লক্ষণই মাদকাসক্তি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পূর্বাভাস হতে পারে। তাই শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও তুলে ধরেন ডা. তাহের। তিনি বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ, র‌্যাব এবং অন্যান্য সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অনেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র গ্রেপ্তার বা অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

তার ভাষায়, “অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” এজন্য তিনি স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন।

ডা. তাহের বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সমাজের শত্রু। তারা অর্থের লোভে তরুণদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য জানা গেলে তা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। তরুণদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারলে অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।

সভায় উপস্থিত অভিভাবক ও সমাজকর্মীরা ডা. তাহেরের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তারা বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, নিয়মিত যোগাযোগ এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে রাখা সম্ভব।

তরুণদের উদ্দেশে ডা. তাহের বলেন, “তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ। নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে। মাদক, অপরাধ ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।”

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তরুণদের জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সৃজনশীলতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সময় নষ্ট করে অপরাধ বা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়লে ব্যক্তিগত জীবন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি দেশের উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ডা. তাহের আবারও দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে চাই যেখানে তরুণরা স্বপ্ন দেখবে, শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। কোনো মাদক ব্যবসায়ী কিংবা অপরাধচক্র আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করতে পারবে না।”

তার এই বক্তব্য উপস্থিত সবার মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অংশগ্রহণকারীরা মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত সমাজ গঠনে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা মনে করেন, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তাহলে একটি নিরাপদ, সুন্দর এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ডা. তাহেরের এই আহ্বান তাই শুধু একটি বক্তব্য নয়, বরং একটি সামাজিক বার্তা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই একটি নিরাপদ, মানবিক এবং সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম চলবে : ‎ডা. তাহের

Update Time : ০৮:৩৭:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

মাদকবিরোধী সংগ্রাম চলমান থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ডা. তাহের। তিনি বলেছেন, সমাজকে মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে হবে না, বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সম্প্রতি আয়োজিত এক সচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. তাহের এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে দেশের অন্যতম বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি।

ডা. তাহের বলেন, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই তরুণদের একটি অংশ মাদকাসক্তি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রও। তিনি বলেন, মাদক একজন মানুষের চিন্তাশক্তি, বিবেক, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারও বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেক কিশোর অল্প বয়সেই ভুল বন্ধুত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং পারিবারিক নজরদারির অভাবে অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। প্রথমে তারা ছোটখাটো দুষ্টুমি বা দলবদ্ধ ঘোরাফেরার মাধ্যমে শুরু করলেও একসময় মারামারি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই এবং অন্যান্য অপরাধে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন  ইউনিপে টু বাংলাদেশের পরিচালক তাহেরের আয়কর নথি জব্দ

ডা. তাহেরের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে বেশ কিছু সামাজিক কারণ রয়েছে। পরিবারে সময়ের অভাব, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এর অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে অনেক অভিভাবক জীবিকার প্রয়োজনে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সময় দেওয়ার সুযোগ পান না। ফলে সন্তানরা মানসিকভাবে একাকিত্ব অনুভব করে এবং ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

তিনি বলেন, একটি শিশুর প্রথম শিক্ষালয় হলো পরিবার। পরিবার থেকেই একজন শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখে। তাই সন্তানকে শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক আচরণ গঠনের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত—এসব বিষয়ে পরিবারের নজরদারি থাকতে হবে।

মাদকবিরোধী সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ডা. তাহের। তিনি বলেন, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞানচর্চা এবং সৃজনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের ইতিবাচক পথে পরিচালিত করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা উচিত।

তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ করে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে, ফলাফলে অবনতি ঘটলে কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করলে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। অনেক সময় এসব লক্ষণই মাদকাসক্তি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পূর্বাভাস হতে পারে। তাই শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও তুলে ধরেন ডা. তাহের। তিনি বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ, র‌্যাব এবং অন্যান্য সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অনেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র গ্রেপ্তার বা অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন  জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে বিমানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

তার ভাষায়, “অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” এজন্য তিনি স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন।

ডা. তাহের বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সমাজের শত্রু। তারা অর্থের লোভে তরুণদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য জানা গেলে তা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। তরুণদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারলে অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।

সভায় উপস্থিত অভিভাবক ও সমাজকর্মীরা ডা. তাহেরের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তারা বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, নিয়মিত যোগাযোগ এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে রাখা সম্ভব।

তরুণদের উদ্দেশে ডা. তাহের বলেন, “তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ। নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে। মাদক, অপরাধ ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।”

আরও পড়ুন  বেইলি রোডের আগুনের ঘটনায় ১৩ পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তরুণদের জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সৃজনশীলতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সময় নষ্ট করে অপরাধ বা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়লে ব্যক্তিগত জীবন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি দেশের উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ডা. তাহের আবারও দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে চাই যেখানে তরুণরা স্বপ্ন দেখবে, শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। কোনো মাদক ব্যবসায়ী কিংবা অপরাধচক্র আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করতে পারবে না।”

তার এই বক্তব্য উপস্থিত সবার মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অংশগ্রহণকারীরা মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত সমাজ গঠনে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা মনে করেন, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তাহলে একটি নিরাপদ, সুন্দর এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ডা. তাহেরের এই আহ্বান তাই শুধু একটি বক্তব্য নয়, বরং একটি সামাজিক বার্তা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই একটি নিরাপদ, মানবিক এবং সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।